পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির অলিন্দে গত কয়েক বছর ধরে যে নাটকের মহড়া চলছিল, শনিবার তার চূড়ান্ত যবনিকা পতন ঘটল। এক সময়ের অত্যন্ত বিশ্বস্ত সেনাপতি থেকে ঘোরতর শত্রুতে পরিণত হওয়া শুভেন্দু অধিকারী এখন রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান। আজ ৯ মে, ২০২৬ শনিবার আনুষ্ঠানিকভাবে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন তিনি।
শুভেন্দুর এই উত্থান কেবল একটি রাজনৈতিক পালাবদল নয়, বরং এটি ভারতের অন্যতম বর্ণময় এবং প্রভাবশালী নেত্রী মমতা ব্যানার্জির ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক পরাজয়ের এক দীর্ঘ উপাখ্যান। মাত্র পাঁচ বছর আগেও যিনি মমতার ডান হাত হিসেবে পরিচিত ছিলেন, তিনিই আজ তৃণমূল কংগ্রেসকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে বঙ্গ রাজনীতির নিয়ন্ত্রক হয়ে দাঁড়িয়েছেন।
সংবাদমাধ্যম আউটলুক ইন্ডিয়ার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, শুভেন্দুর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের তিনটি স্তম্ভ তাকে এই উচ্চতায় নিয়ে এসেছে। প্রথমত, নন্দিগ্রামের সেই উত্তাল জমি আন্দোলন। দ্বিতীয়ত, মমতা ব্যানার্জির সঙ্গে তার তীব্র ও ব্যক্তিগত পর্যায়ের সংঘাত। এবং সর্বশেষ, হিন্দুত্ববাদী ভারতীয় জনতা পার্টিতে (বিজেপি) তার নাটকীয় অন্তর্ভুক্তি।
শুভেন্দু অধিকারীর রাজনীতিতে হাতেখড়ি তার বাবার হাত ধরে। একটি সুপ্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক পরিবারে বেড়ে ওঠা এই নেতা ১৯৯৮ সালে তৃণমূল কংগ্রেসের জন্মলগ্ন থেকেই মমতা ব্যানার্জির পাশে ছিলেন। ২০০৬ সালে পৌরসভা নির্বাচনে জয়ের মাধ্যমে শুরু হয় তার বিজয়রথ।
২০০৭ সালের কথা। তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারের শিল্পায়নের নামে জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিল নন্দিগ্রাম। সেই আন্দোলনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে গ্রামবাসীর কাছে ‘নন্দিগ্রামের নায়ক’ হয়ে উঠেছিলেন শুভেন্দু। তার সেই লড়াই মমতা ব্যানার্জিকে ২০১১ সালে মহাকরণের গদিতে বসাতে প্রধান ভূমিকা রেখেছিল।
২০১১ থেকে ২০২০ পর্যন্ত শুভেন্দু ছিলেন তৃণমূলের অবিসংবাদিত সেকেন্ড-ইন-কমান্ড। সাংসদ থেকে পদত্যাগ করে রাজ্য মন্ত্রিসভার সেচ, পরিবহন ও পানিসম্পদের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় সামলেছেন তিনি। কিন্তু এই নিবিড় সম্পর্কে ফাটল ধরে পরিবারের অভ্যন্তরীণ উত্তরাধিকার কেন্দ্র করে।
মমতা ব্যানার্জির ভাইপো অভিষেক ব্যানার্জির দলে ক্রমবর্ধমান প্রভাব শুভেন্দু সহজভাবে নিতে পারেননি। তৃণমূলের অভ্যন্তরে এক ধরনের অস্বস্তি দানা বাঁধছিল। শুভেন্দু অনুভব করতে শুরু করেছিলেন যে, দলের জন্মলগ্ন থেকে ঘাম ঝরানো নেতাদের চেয়ে পারিবারিক সম্পর্কের গুরুত্ব বেড়ে যাচ্ছে।
২০২০ সালের ডিসেম্বরে সেই দীর্ঘ জল্পনার অবসান ঘটে। অমিত শাহের হাত ধরে মেদিনীপুরের জনসভায় গেরুয়া পতাকা তুলে নেন তিনি। এটি কেবল দলবদল ছিল না, বরং ছিল দিদির শাসনের ভিত কাঁপিয়ে দেওয়ার এক প্রকাশ্য অঙ্গীকার। যার ফলাফল আজ সারা ভারত দেখছে।
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে নন্দিগ্রামে সরাসরি মমতা ব্যানার্জির মুখোমুখি হয়েছিলেন তিনি। সেই স্নায়ুক্ষয়ী লড়াইয়ে ১৯৫৬ ভোটে মমতাকে পরাজিত করে তিনি প্রমাণ করেছিলেন, দিদির ব্যক্তিগত ক্যারিশমার চেয়ে মেদিনীপুরের মাটির টান অনেক বেশি জোরালো।
সেই জয়ের ধারা এবারের নির্বাচনে আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। নিজের পুরনো গড় ভবানিপুরেও এবার রক্ষা পাননি মমতা ব্যানার্জি। সেখানে ১৫ হাজারেরও বেশি ভোটের ব্যবধানে তাকে পরাজিত করেছেন শুভেন্দু। এই হার কেবল মমতার ব্যক্তিগত পরাজয় নয়, বরং তৃণমূলের শাসনের চূড়ান্ত অবসান।
২০২৬ সালের এই নির্বাচনে ২৯৪টি আসনের মধ্যে বিজেপি এককভাবে ২০৭টি আসনে জয়লাভ করেছে। এটি পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে অভূতপূর্ব। হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির পাশাপাশি শুভেন্দুর স্থানীয় মানুষের ওপর প্রভাব— এই দুইয়ের মিশেলে বিজেপি রাজ্যে প্রথম সরকার গঠন করল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, শুভেন্দুর লড়াই ছিল মূলত টিকে থাকার এবং নিজের রাজনৈতিক পরিচয় প্রমাণের। মমতার ছায়া থেকে বেরিয়ে তিনি নিজেই এখন একটি মহীরুহে পরিণত হয়েছেন। তার এই জয় প্রমাণ করে যে, রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই; বিশ্বস্ত বন্ধুও পরিস্থিতির চাপে প্রবলতম প্রতিপক্ষ হতে পারে।
শনিবারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানটি ছিল আড়ম্বরপূর্ণ কিন্তু গাম্ভীর্যে ভরা। রাজভবনের শপথ শেষে শুভেন্দু যখন বেরিয়ে এলেন, তার চোখেমুখে ছিল এক ধরনের তৃপ্তি। যে মমতাকে তিনি একসময় ‘নেত্রী’ মানতেন, আজ সেই মমতাকেই বিধানসভার বিরোধী আসনে বসতে বাধ্য করেছেন তিনি।
শুভেন্দুর মন্ত্রিসভায় কারা থাকছেন, তা নিয়ে এখন চলছে ব্যাপক জল্পনা। তবে এটা স্পষ্ট যে, নতুন সরকারে তার অনুগত এবং পুরনো তৃণমূলী নেতাদের চেয়ে কট্টর বিজেপি কর্মীদের গুরুত্ব বেশি থাকবে। রাজ্য প্রশাসনে বড় ধরণের রদবদলও এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
মমতা ব্যানার্জির শাসনের এই পতনকে অনেক বিশেষজ্ঞ ‘একটি যুগের অবসান’ হিসেবে দেখছেন। দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে পশ্চিমবঙ্গ শাসন করা তৃণমূল এখন অস্তিত্ব সংকটে। অভিষেক ব্যানার্জির নেতৃত্ব নিয়েও দলের ভেতর প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
অন্যদিকে শুভেন্দুর সামনে এখন পাহাড়প্রমাণ চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘ দিনের ঋণে জর্জরিত পশ্চিমবঙ্গকে আবার অর্থনৈতিকভাবে চাঙা করা এবং শিল্পায়ন ফিরিয়ে আনা তার প্রধান লক্ষ্য হবে। নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো রক্ষা করা তার জন্য হবে এক অগ্নিপরীক্ষা।
বাঙালি আবেগের সঙ্গে হিন্দুত্ববাদের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে শুভেন্দু যেভাবে ভোট ব্যাংক তৈরি করেছেন, তা ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাসে গবেষণার বিষয় হতে পারে। তিনি নিজেকে ‘ভূমিপুত্র’ হিসেবে উপস্থাপন করে মমতা ব্যানার্জির ‘বহিরাগত’ তত্ত্বকে নস্যাৎ করে দিয়েছেন।
শপথ শেষে শুভেন্দু বলেন, “এ জয় বাংলার মানুষের। আমরা সোনার বাংলা গড়ার যে স্বপ্ন দেখেছি, আজ থেকে তার বাস্তবায়ন শুরু হবে। প্রতিহিংসার রাজনীতি ভুলে আমরা উন্নয়নের দিকে নজর দেব।” যদিও বিরোধীরা তার এই বক্তব্যে খুব একটা আশ্বস্ত হতে পারছেন না।
শুভেন্দু অধিকারীর এই যাত্রাপথ মসৃণ ছিল না। গত পাঁচ বছরে তাকে অসংখ্য আইনি লড়াই ও কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার জেরার সম্মুখীন হতে হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই তিনি আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে এসেছেন। তার রাজনৈতিক জেদই তাকে আজ পশ্চিমবঙ্গের মসনদে বসিয়েছে।
এখন দেখার বিষয়, নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দু কতটা সফল হন। যে নন্দিগ্রাম তাকে হিরো বানিয়েছিল, সেই নন্দিগ্রামের মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করা তার প্রথম দায়িত্ব। একইসঙ্গে সমগ্র পশ্চিমবঙ্গের আইনশৃঙ্খলা ও বেকারত্ব দূরীকরণে তার পদক্ষেপের দিকে তাকিয়ে আছে কোটি কোটি মানুষ।
বাঙালি রাজনীতির সমীকরণ এখন সম্পূর্ণ বদলে গেছে। মমতা ব্যানার্জি এখন প্রান্তিক শক্তিতে পরিণত হয়েছেন, আর শুভেন্দু অধিকারী হয়েছেন চালক। বন্ধুত্বের বিচ্ছেদ যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তার চাক্ষুষ প্রমাণ এখন পশ্চিমবঙ্গের লাল ডায়েরিতে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
শনিবারের এই সূর্যোদয় পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক নতুন প্রভাত নিয়ে এলো। সুপারস্টার থেকে রাজনীতিবিদ হওয়া বিজয় তামিলনাড়ুতে যা করেছেন, শুভেন্দু অধিকারী পশ্চিমবঙ্গে তার চেয়েও বড় ধাক্কা দিলেন। এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা, পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যৎ রূপরেখা শুভেন্দু কীভাবে আঁকেন।

