দক্ষিণ ভারতের রাজনীতির রুপালি পর্দার রোমাঞ্চ এবার বাস্তবতায় রূপ নিতে যাচ্ছে। চার দিনের তীব্র উৎকণ্ঠা আর স্নায়ুযুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে তামিলনাড়ুর মসনদে বসতে চলেছেন মেগাস্টার থালাপতি বিজয়।
শনিবার সন্ধ্যায় রাজ্যের গভর্নর আরভি আরলেকারের সঙ্গে দেখা করে সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিক দাবি জানিয়েছেন ‘তামিলাগা ভেট্টি কাজগাম’ (টিভিকে) প্রধান। এর মাধ্যমে রাজ্যটির কয়েক দশকের প্রথাগত রাজনৈতিক সমীকরণ এক ধাক্কায় বদলে দিলেন এই অভিনেতা।
গভর্নরের বাসভবন রাজভবন থেকে পাওয়া খবর অনুযায়ী, বিজয় তার সপক্ষে ১২০ জন বিধায়কের সমর্থনপত্র জমা দিয়েছেন। ২৩৪ আসনের তামিলনাড়ু বিধানসভায় ম্যাজিক ফিগার ১১৮। প্রয়োজনীয় সংখ্যার চেয়ে দুটি আসন বেশি নিয়ে এখন অনেকটাই স্বস্তিতে থালাপতি শিবির।
এনডিটিভি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, সবকিছু ঠিক থাকলে রোববার (১০ মে) বিকেল ৩টা ১৫ মিনিটে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন বিজয়। টিভিকে শিবিরের অভ্যন্তরে এখন সাজ সাজ রব। দলের কর্মীরা চাচ্ছেন কালকের মধ্যেই যেন রাজ্যাভিষেকের সব প্রক্রিয়া শেষ হয়।
বিজয়ের এই উত্থান তামিল রাজনীতির জন্য এক নতুন অধ্যায়। দীর্ঘ সময় ধরে ডিএমকে এবং এআইএডিএমকে-র দ্বিমেরু রাজনীতিতে যে স্থবিরতা ছিল, টিভিকে-র এই জয় তাকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। ভক্তদের কাছে তিনি কেবল একজন অভিনেতা নন, এখন তিনি রাজ্যের ভাগ্যবিধাতা।
গভর্নর হাউসের বাইরে শনিবার রাত থেকেই মানুষের ঢল নেমেছে। সমর্থকদের গগনবিদারী স্লোগান আর আতশবাজির আলোয় চেন্নাইয়ের রাজপথ এখন উৎসবের নগরী। বিজয়ের ছবি সম্বলিত বিশাল সব ব্যানার আর পোস্টারে ছেয়ে গেছে গোটা শহর।
তবে এই জয়ের পথ খুব একটা মসৃণ ছিল না। গত চার দিন ধরে তামিলনাড়ুর আকাশে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কালো মেঘ জমেছিল। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় জোট গঠনের জটিলতায় আটকে ছিল সরকার গঠনের প্রক্রিয়া।
শেষ মুহূর্তে স্থানীয় রাজনৈতিক দল ভিসিকে (Viduthalai Chiruthaigal Katchi) এবং ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লিগ (আইইউএমএল) বিজয়কে নিঃশর্ত সমর্থন দিলে ভাগ্য খুলে যায় তার। ছোট দলগুলোর এই সমর্থনই বিজয়কে ক্ষমতার শীর্ষে নিয়ে এলো।
ভিসিকে সভাপতি থল থিরুমাভালাভান সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, রাজ্যে যেন কোনোভাবেই রাষ্ট্রপতি শাসন জারি না হয়, সেই স্বার্থেই তারা বিজয়কে সমর্থন দিচ্ছেন। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনাই এখন তাদের প্রধান লক্ষ্য।
থিরুমাভালাভান স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, এই সমর্থনের পেছনে কোনো গোপন শর্ত নেই। তিনি বলেন, “আমরা চাই রাজ্যে একটি নির্বাচিত সরকার থাকুক। বিজয়কে আমরা শুভকামনা জানিয়েছি এবং ডিএমকে প্রধান এম কে স্ট্যালিনকেও আমাদের সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে।”
এদিকে চেন্নাইয়ের টিভিকের সদর দপ্তরের সামনে তিল ধারণের জায়গা নেই। কয়েক হাজার গাড়ির বহর আর উৎসুক জনতার ভিড়ে ওই এলাকায় যানজট স্থায়ী রূপ নিয়েছে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হিমশিম খাচ্ছে, তবুও মানুষের আনন্দ থামানো যাচ্ছে না।
বিশ্লেষকদের মতে, থালাপতি বিজয়ের এই বিজয় কেবল তার জনপ্রিয়তার ফসল নয়। সাধারণ মানুষ দুই দ্রাবিড় দলের বাইরে তৃতীয় একটি বিকল্প খুঁজছিল। বিজয় সেই শূন্যস্থানটি পূরণ করতে পেরেছেন তার স্বচ্ছ ভাবমূর্তি আর জনকল্যাণমূলক প্রচারণার মাধ্যমে।
রোববারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে ভারতের শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং চলচ্চিত্র জগতের মহাতারকাদের সমাগম ঘটবে বলে আশা করা হচ্ছে। তামিলনাড়ুর সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা এখন আকাশচুম্বী। তারা দেখতে চান রুপালি পর্দার ‘থালাপতি’ বাস্তবে কতটা সফল হন।
এম কে স্ট্যালিনের ডিএমকে সরকারের পরাজয়ের পর ক্ষমতার এই পালাবদল তামিলনাড়ুর প্রশাসনিক কাঠামোতে বড় ধরণের পরিবর্তন আনতে পারে। বিজয়ের মন্ত্রিসভায় কারা থাকছেন, তা নিয়েও এখন চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
শনিবারের এই নাটকীয় মোড় ছিল মূলত অনিশ্চয়তার যবনিকা। গত কয়েকদিন ধরে জল্পনা চলছিল, ছোট দলগুলো হয়তো ডিএমকে-র সঙ্গেই থাকবে। কিন্তু বিজয়ের রাজনৈতিক কূটনীতি শেষ পর্যন্ত সফল হয়েছে এবং তিনি মিত্রদের নিজের পাশে টানতে পেরেছেন।
তামিলনাড়ু সব সময়ই অভিনেতাদের রাজনীতিতে আসার জন্য উর্বর ভূমি হিসেবে পরিচিত। এমজিআর কিংবা জয়ললিতার মতো তারকারা যেভাবে রাজ্য শাসন করেছেন, বিজয় সেই ধারাকে আরও আধুনিক রূপে ফিরিয়ে আনবেন বলেই মনে করছেন তার অনুসারীরা।
রোববার বিকেলের সেই মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায় এখন পুরো ভারত। চেন্নাইয়ের আকাশ এখন কেবল একটি নামেই মুখরিত—থালাপতি। রাজনীতির ময়দানে নতুন এই নেতার অভিষেক দক্ষিণ ভারতের ক্ষমতার ভারসাম্য কোন দিকে নিয়ে যায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
তবে বিজয়ের সামনে পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান এবং রাজ্যের বিশাল ঋণ পরিশোধের মতো বিষয়গুলো তাকে শুরুতেই মোকাবিলা করতে হবে। পর্দার লড়াইয়ের চেয়ে এই লড়াই যে অনেক বেশি কঠিন, তা বিজয় নিজেও নিশ্চয়ই জানেন।
শনিবারের এই দাবি জানানোর মধ্য দিয়ে তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে একটি দীর্ঘ শূন্যতার অবসান হলো। জনতা এখন প্রস্তুত তাদের প্রিয় নায়ককে মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বরণ করে নিতে। রাজভবন থেকে বেরোনোর সময় বিজয়ের সেই চিরচেনা হাসি আজ ভক্তদের মনে অন্যরকম এক ভরসা জুগিয়েছে।
তামিলনাড়ুর এই পরিবর্তন পুরো ভারতের আঞ্চলিক রাজনীতিতে এক শক্তিশালী বার্তা পাঠালো। জনসমর্থন থাকলে যে প্রথাগত শক্তির দুর্গ ভাঙা সম্ভব, থালাপতি বিজয় আজ তা হাতেকলমে প্রমাণ করলেন। এখন শুধু কালকের শপথের অপেক্ষা।

