সারাদেশে হামের প্রকোপ এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। গত এক দিনে এই সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে এবং এর উপসর্গ নিয়ে আরও ৯টি শিশু প্রাণ হারিয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্যে এই চিত্র উঠে এসেছে, যা দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করছে।
শনিবার (৯ মে) প্রকাশিত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত বুলেটিনে জানানো হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় যে নয়জন মারা গেছে, তাদের মধ্যে ৩ জন নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত ছিল। বাকি ৬ জন মারা গেছে হামের তীব্র উপসর্গ নিয়ে। হাসপাতালগুলোতে তিল ধারণের জায়গা নেই, বিশেষ করে শিশু ওয়ার্ডগুলোতে দেখা দিয়েছে শয্যা সংকট।
চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই প্রাদুর্ভাব এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। গত দেড় মাসে দেশে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৫২ জনে। এর মধ্যে ৬১ জনের মৃত্যু ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া গেছে, আর বাকি ২৯১ জনের মৃত্যু হয়েছে হামের স্পষ্ট লক্ষণ নিয়ে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১ হাজার ৪৩৫ জন শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। গ্রাম থেকে শহর—কোথাও এই সংক্রমণের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না শিশুরা। প্রতিদিন শত শত নতুন রোগী শনাক্ত হওয়ায় হিমশিম খাচ্ছে স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো।
পরিসংখ্যান বলছে, আক্রান্ত ও মৃত্যুর হারের দিক থেকে সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় রয়েছে ঢাকা বিভাগ। মেগাসিটি ঢাকা ও এর আশেপাশের জেলাগুলোতে ঘনবসতির কারণে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। শুধুমাত্র এই বিভাগেই এখন পর্যন্ত ১৭৩ জন শিশু প্রাণ হারিয়েছে, যা মোট মৃত্যুর প্রায় অর্ধেক।
ঢাকা বিভাগে আক্রান্তের সংখ্যাও রীতিমতো আঁতকে ওঠার মতো। এখন পর্যন্ত এই অঞ্চলে ২৬ হাজার ৮০ জন শিশু হাম বা এর উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসার শরণাপন্ন হয়েছে। রাজধানীর বড় হাসপাতালগুলোর মেঝেতেও এখন আক্রান্ত শিশুদের ঠাঁই দিতে হচ্ছে অভিভাবকদের।
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা সাধারণত শ্বাসতন্ত্রের মাধ্যমে ছড়ায়। শিশুদের মধ্যে পুষ্টির অভাব এবং টিকাদানে ঘাটতি থাকলে এই রোগ প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। বর্তমান পরিস্থিতিতে টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
পুরো দেশের চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত ১৫ মার্চ থেকে ৯ মে সকাল ৮টা পর্যন্ত মোট ৬ হাজার ৯৮৯ জন শিশু নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়েছে। তবে উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি—প্রায় ৪৭ হাজার ৬৫৬ জন। এই বিশাল সংখ্যক রোগীর চাপ সামলানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
মাঠে কর্মরত চিকিৎসকরা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রে শিশুরা দেরিতে হাসপাতালে আসছে। জ্বরের সাথে শরীরে দানা বা র্যাশ দেখা দিলেই দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া জরুরি। কিন্তু সচেতনতার অভাবে অনেক পরিবার ঘরোয়া চিকিৎসায় সময়ক্ষেপণ করছে, যা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।
হামের এই ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণের পেছনে কোভিড-পরবর্তী টিকাদানের অনীহা বা গ্যাপ কাজ করছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তবে মাঠ পর্যায়ের চিত্র বলছে, প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক শিশু নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির (EPI) আওতার বাইরে রয়ে গেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে। দুর্গত এলাকাগুলোতে বিশেষ মেডিকেল টিম পাঠানোর পাশাপাশি ভিটামিন-এ ক্যাপসুল বিতরণ ও জরুরি টিকাদানের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তবে মৃত্যুর মিছিল থামাতে দ্রুত পদক্ষেপের বিকল্প নেই।
শীতের শেষে এবং গ্রীষ্মের শুরুতে সাধারণত হামের প্রকোপ বাড়ে। কিন্তু এবারের সংক্রমণ আগের কয়েক বছরের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। ঢাকার বাইরের জেলাগুলোতেও ভাইরাসটি সমানভাবে দাপট দেখাচ্ছে, যার ফলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের জটিলতা হিসেবে নিউমোনিয়া বা ডায়রিয়া দেখা দিলে শিশুদের বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়ে। চলমান এই প্রাদুর্ভাবে অধিকাংশ মৃত্যুই হয়েছে শ্বাসকষ্টজনিত জটিলতার কারণে। তাই প্রাথমিক পর্যায়েই রোগ শনাক্ত করা এখন জীবন বাঁচানোর প্রধান চাবিকাঠি।
সরকারের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। শিশুদের জনসমাগম এড়িয়ে চলা এবং পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে হাসপাতালগুলোর জরুরি বিভাগে যে হাহাকার দেখা যাচ্ছে, তাতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আশ্বাসের চেয়ে উদ্বেগই বেশি।
আগামী কয়েক সপ্তাহ এই সংক্রমণের হার কোন দিকে যায়, তার ওপর নির্ভর করছে দেশের জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি। যদি এখনই কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয়, তবে এই মৃত্যুর তালিকা আরও দীর্ঘ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। স্বাস্থ্য খাতের জন্য এটি এখন এক অগ্নিপরীক্ষা।
টিকাদানই হাম প্রতিরোধের একমাত্র কার্যকর উপায়। সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় প্রতিটি শিশুকে নির্দিষ্ট সময়ে হামের টিকা নিশ্চিত করার তাগিদ দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। একইসঙ্গে আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত আইসোলেশনে রাখার পরামর্শ দেয়া হয়েছে যাতে সংক্রমণ আর না ছড়ায়।
জাতীয় এই সংকটে বেসরকারি সংস্থা এবং সামাজিক সংগঠনগুলোকেও এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা বিভাগের হটস্পটগুলোতে জরুরি সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো জরুরি হয়ে পড়েছে। নয়তো এই ৯ শিশুর মৃত্যু কেবল একটি সংখ্যার শুরু হয়েই থাকবে।
দেশের সাধারণ মানুষ এখন তাকিয়ে আছে কার্যকর কোনো পদক্ষেপের দিকে। শিশুদের এই অকাল মৃত্যু রোধে পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ এবং বিশেষায়িত চিকিৎসার ব্যবস্থা করাই এখন সময়ের দাবি। জনস্বাস্থ্য রক্ষায় কোনো শিথিলতার সুযোগ নেই বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

