ঢাকার আকাশে তখন গোধূলির আলো। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে সাংবাদিকদের ক্যামেরার ফ্ল্যাশ আর অবিরত প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একগাল হাসলেন নবনির্বাচিত সভাপতি। কূটনৈতিক লড়াইতে এক রুদ্ধশ্বাস জয়ের পর তার এই স্বদেশ প্রত্যাবর্তন। মুখে ক্লান্তির চেয়েও বেশি ছিল এক ধরনের আত্মপ্রত্যয়। আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের এই গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের নায়ক আর কেউ নন, স্বয়ং পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়ে দেশে ফেরার পর বৃহস্পতিবার (৪ জুন) বিকেলে তিনি মুখোমুখি হন সংবাদমাধ্যমের। সম্মেলন কক্ষের চেনা টেবিলে বসে তিনি যখন কথা বলছিলেন, তখন তার প্রতিটি শব্দে ছিল বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করার এক নতুন আকাঙ্ক্ষা। তবে এই আনন্দের আবহেও একটি সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন বারবার ঘুরেফিরে আসছিল। তিনি কি একই সঙ্গে দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব এবং জাতিসংঘের মতো একটি বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মের শীর্ষ পদ সামলাতে পারবেন?
প্রশ্নটি ছুড়ে দেওয়া মাত্রই খলিলুর রহমান কিছুটা নড়েচড়ে বসলেন। মুচকি হেসে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বললেন, “ভাই, এত ব্যস্ত হওয়ার কিছু নেই। একই সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালনের নজির ইতিহাসে রয়েছে।” তার এই একটি বাক্যই যেন গত কয়েকদিনের সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে দিল।
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ও ৪০ বছর আগের স্মৃতি
নিজের এই দাবির সপক্ষে খলিলুর রহমান নিজেই এক জীবন্ত ইতিহাসের পাতা উল্টালেন। তিনি ফিরে গেলেন আজ থেকে ঠিক চার দশক আগের এক গৌরবময় অতীতে। ১৯৮৬ সালের সেই দিনগুলোর কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রাক্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রয়াত হুমায়ূন রশীদ চৌধুরীও এই একই গৌরব অর্জন করেছিলেন। তিনি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন।
স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে খলিলুর রহমান বলেন, “আমি তখন হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী সাহেবের একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলাম। তার অত্যন্ত কাছে থেকে কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। আমি নিজে দেখেছি, তিনি কীভাবে দুটি পদের দায়িত্বই সমান দক্ষতা এবং পূর্ণকালীনভাবে সামলেছেন। কোনো পদে থেকেই অন্য পদের কাজে বিন্দুমাত্র ব্যাঘাত ঘটেনি।”
কূটনৈতিক এই অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বর্তমান সময়ের প্রযুক্তির উৎকর্ষতার দিকে ইঙ্গিত করেন। তিনি বলেন, “ওই সময়টা ছিল ইন্টারনেট-পূর্ব যুগ। যোগাযোগের মাধ্যম ছিল খুবই সীমিত এবং ধীরগতির। কিন্তু আজকে প্রযুক্তির যুগে পৃথিবী আমাদের হাতের মুঠোয়। আপনি এখন নিরবচ্ছিন্নভাবে দুটো কাজই একসঙ্গে করতে পারেন। আজকের দিনে এটা খুবই স্বাভাবিক এবং সহজ।”
বৈশ্বিক উদাহরণের বিভ্রান্তি ও জার্মানির প্রসঙ্গ
সংবাদ সম্মেলনে আন্তর্জাতিক কিছু উদাহরণের বিষয়ে সাংবাদিকদের বিভ্রান্তি দূর করার চেষ্টা করেন নতুন এই সভাপতি। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনা ছিল যে, জার্মানির একজন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাতিসংঘের পদ পাওয়ার পর নিজের মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দিয়েছিলেন। খলিলুর রহমানের ক্ষেত্রেও তেমন কিছু ঘটবে কিনা, তা জানতে চান এক গণমাধ্যমকর্মী।
প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় বাস্তব চিত্রটি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “জার্মানির সেই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিষয়টি আসলে ভিন্ন ছিল। অনেকেই বলছেন তিনি পদ ছেড়ে কাজ করেছেন। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো, তিনি ছিলেন গ্রিন পার্টির একজন শীর্ষ নেতা। সেই সময় জার্মানির সাধারণ নির্বাচনে তার দল গ্রিন পার্টি হেরে যায়। রাজনৈতিক সমীকরণের কারণে তিনি আর পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে থাকতে পারেননি, পদত্যাগের কোনো বাধ্যবাধকতা থেকে নয়।”
এই ব্যাখ্যার মাধ্যমে খলিলুর রহমান স্পষ্ট করে দিলেন যে, দেশের মন্ত্রিত্ব এবং জাতিসংঘের সভাপতি পদের মধ্যে আইনি বা প্রাতিষ্ঠানিক কোনো সংঘাত নেই। বরং দুটি পদের সমন্বয় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতিকে বৈশ্বিক দরবারে আরও বেশি প্রভাবশালী ও কার্যকর করতে সাহায্য করবে।
১০ বছরের রাস্তা ১০ সপ্তাহে পার করার নেপথ্য
জাতিসংঘের এই মর্যাদাপূর্ণ নির্বাচনে বাংলাদেশের জয়কে খলিলুর রহমান দেশের সাধারণ মানুষের বিজয় হিসেবে দেখছেন। তবে এই অর্জনের পেছনে সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বের সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন এবং কূটনৈতিক দূরদর্শিতার কথা তিনি কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেন। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর অবিচল সমর্থনের কথা তিনি বারবার উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রীর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে খলিলুর রহমান বলেন, “এই বিজয় যেমন বাংলাদেশের, তেমনই এই বিজয় আমাদের প্রধানমন্ত্রীর। তিনি যদি এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত না নিতেন এবং দৃঢ়ভাবে, অবিচলভাবে ও কোনো বিরোধহীনভাবে আমাদের সমর্থন না করতেন, তাহলে এই অর্জন সম্ভব হতো না। যে রাস্তা পার হতে সাধারণত ১০ বছর সময় লাগে, প্রধানমন্ত্রীর সমর্থনে সেই রাস্তা আমরা মাত্র ১০ সপ্তাহে অতিক্রম করতে পেরেছি।”
এই অভাবনীয় কূটনৈতিক সাফল্যের গৌরব খলিলুর রহমান নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চান না। তিনি অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, এই ঐতিহাসিক বিজয়কে তিনি বাংলাদেশের অনাগত ভবিষ্যতের কাছে উৎসর্গ করছেন। নতুন প্রজন্মের হাত ধরে বাংলাদেশ যে বিশ্বমঞ্চে আরও বড় ভূমিকা রাখবে, এই জয় তারই এক আগাম বার্তা।
নিউইয়র্কের সেই রুদ্ধশ্বাস ব্যালট যুদ্ধ
নিউইয়র্কের জাতিসংঘ সদর দপ্তরে স্থানীয় সময় গত মঙ্গলবার যখন ভোটগ্রহণ শুরু হয়, তখন পুরো কূটনৈতিক পাড়ায় ছিল এক টানটান উত্তেজনা। সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচনের এই লড়াইয়ে বাংলাদেশের খলিলুর রহমানের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন সাইপ্রাসের বহুপক্ষীয়তাবিষয়ক বিশেষ দূত আন্দ্রেজ কাকাউরিস। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দুই প্রার্থীরই ছিল ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা।
জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতিনিধিরা গোপন ব্যালটের মাধ্যমে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। নির্বাচনে মোট ১৯০টি ভোট কাস্ট বা জমা পড়েছিল। চূড়ান্ত ভোট গণনায় দেখা যায়, খলিলুর রহমান পেয়েছেন ৯৯টি ভোট। অন্যদিকে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাসের কাকাউরিস পান ৯১টি ভোট।
মাত্র ৮ ভোটের এক রোমাঞ্চকর ব্যবধানে সাইপ্রাসের প্রার্থীকে হারিয়ে শেষ হাসি হাসেন বাংলাদেশের খলিলুর রহমান। এই বিজয়ের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ৪০ বছরের এক দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটল বাংলাদেশের। হুমায়ূন রশীদ চৌধুরীর পর দ্বিতীয় কোনো বাংলাদেশি হিসেবে এই বিরল আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করলেন খলিলুর রহমান।
এক বছরের ম্যান্ডেট ও বাংলাদেশের ভূরাজনীতি
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, খলিলুর রহমানের এই বিজয় বর্তমান বিশ্বরাজনীতিতে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বেরই এক বড় প্রমাণ। আগামী এক বছরের জন্য তিনি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির মূল চেয়ারে বসবেন। এই এক বছর আন্তর্জাতিক শান্তি, নিরাপত্তা এবং টেকসই উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক এজেন্ডাগুলো তার নেতৃত্বেই পরিচালিত হবে।
এই পদের কারণে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের কথা বলার শক্তি অনেক বেড়ে যাবে। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তন, রোহিঙ্গা সংকট এবং স্বল্পোন্নত দেশগুলোর অর্থনৈতিক অধিকার আদায়ের সংগ্রামে বাংলাদেশ এখন আরও শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে পারবে। একই সঙ্গে দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকায় দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এই পদের প্রভাব ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
তবে এই দ্বৈত ভূমিকা পালন করা খলিলুর রহমানের জন্য খুব একটা সহজ হবে না বলেও মনে করছেন অনেক প্রবীণ কূটনীতিক। নিউইয়র্ক এবং ঢাকার সময়ের ব্যবধান এবং দুটি পদের বিশাল কাজের চাপ সামলানো এক বড় চ্যালেঞ্জ। যদিও খলিলুর রহমান নিজেই জানিয়েছেন, আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় তিনি এই দুই দায়িত্বের মধ্যে এক চমৎকার ভারসাম্য বজায় রাখতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
নতুন দিগন্তের অপেক্ষায় দেশের কূটনীতি
সংবাদ সম্মেলনের শেষভাগে এসে সম্মেলন কক্ষের পরিবেশ কিছুটা হালকা হয়ে ওঠে। খলিলুর রহমান উপস্থিত সাংবাদিকদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, এই বিজয় কেবল এক বছরের একটি পদের লড়াই নয়, এটি বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের মর্যাদা ও সক্ষমতার এক নতুন স্বীকৃতি। এটি প্রমাণ করে যে, সঠিক কৌশল ও দৃঢ় নেতৃত্ব থাকলে যেকোনো আন্তর্জাতিক লড়াইতে বাংলাদেশ জয়ী হতে পারে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারাও এই বিজয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, খলিলুর রহমানের এই এক বছরের কার্যকাল বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে এক স্বর্ণালী অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এখন দেখার বিষয়, আগামী দিনগুলোতে তিনি কীভাবে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক এই বিশাল দায়িত্বের মধ্যে সমন্বয় ঘটান।
বিকেলের আলো ফুরিয়ে যখন রাজধানীর রাস্তায় বাতিগুলো জ্বলতে শুরু করেছে, তখনো পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের করিডোরে চলফেরা মানুষের মুখে এই জয়ের গুঞ্জন। খলিলুর রহমানের কাঁধে এখন এক বিশাল ঐতিহাসিক দায়ভার। ৪০ বছর আগে যে পথ দেখিয়েছিলেন হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী, সেই পথেই নতুন উদ্যমে যাত্রা শুরু করলেন খলিলুর রহমান। বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের পতাকা আরও উঁচুতে তুলে ধরার এই মিশন সফল হোক, আজকের দিনে এটিই পুরো দেশের প্রত্যাশা।

