ঝিরঝিরে বৃষ্টির আভাস ছিল বাতাসের আর্দ্রতায়। বিকালের পড়ন্ত আলোয় কারওয়ান বাজার আর শাহবাগের দিকে গাড়ির হর্ন আর ইঞ্জিনের গর্জন তখন তীব্র হতে শুরু করেছে। অফিস ছুটির ঠিক আগের এই সময়টাতে ঢাকার প্রতিটি মোড়ে ট্রাফিক পুলিশের সদস্যদের ব্যস্ততা বেড়ে যায় কয়েক গুণ। ঠিক তেমনই এক মুহূর্তে মিন্টো রোডের ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে গণমাধ্যমকর্মীদের মুখোমুখি হয়েছিলেন ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ।
এদিনের সংবাদ সম্মেলনের মূল বিষয়বস্তু ছিল রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও ঢাকা ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় পুলিশের সাম্প্রতিক সাফল্য। সেখানে অবধারিতভাবেই আসে ভিআইপি প্রটোকল এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তির প্রসঙ্গটি। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বেশ দৃঢ়তার সঙ্গেই কমিশনার মন্তব্য করেন, ট্রাফিক আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো আপস করা হচ্ছে না।
কমিশনার বলেন, “আমাদের কাছে পরিষ্কার বার্তা রয়েছে। ট্রাফিক আইন আসলে সবার জন্যই সমান, সে সরকারি হোক কিংবা বেসরকারি। এমনকি আমাদের কোনো পুলিশ সদস্যও যদি আইন অমান্য করেন, তবে সাধারণ মানুষের মতোই তার বিরুদ্ধে ট্রাফিক আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” তিনি আরও যোগ করেন, দেশের প্রধানমন্ত্রীও এখন ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে যাতায়াত করেন, যা আইন প্রয়োগে এক নতুন দৃষ্টান্ত।
বক্তব্যের রেশ না কাটতেই ভিন্ন চিত্র
কিন্তু বিধি ও বাস্তবতার মধ্যকার দূরত্ব কতখানি, তার প্রমাণ মিলল এই বক্তব্যের ঠিক কয়েক মিনিট পরেই। সংবাদ সম্মেলন শেষ করে ডিএমপি কমিশনারের গাড়িবহর যখন মিডিয়া সেন্টার থেকে বের হয়, তখন ঘড়িতে বিকেল ৪টা ৫৮ মিনিট। গণমাধ্যমকর্মীদের অনেকেই তখনো ডিএমপি অফিসের প্রাঙ্গণে অবস্থান করছিলেন।
মিডিয়া সেন্টার থেকে ডিএমপি সদর দপ্তরের দূরত্ব খুব বেশি নয়। তবে ট্রাফিক নিয়ম অনুযায়ী, মিন্টো রোডের ওই নির্দিষ্ট ক্রসিংটি সাধারণ যানবাহনের জন্য সম্পূর্ণ ‘ওয়ান ওয়ে’ বা একমুখী করা। নিয়ম অনুযায়ী, মগবাজারের দিক থেকে আসা যানবাহনগুলোই কেবল সেখান দিয়ে ইউটার্ন নিতে পারে।
মিন্টো রোড থেকে কোনো গাড়ি যদি ডিএমপি সদর দপ্তরের দিকে যেতে চায়, তবে তাকে মগবাজার ফ্লাইওভারের নিচ পর্যন্ত গিয়ে অনেকটা পথ ঘুরে আসতে হয়। সাধারণ নাগরিকেরা প্রতিদিন এই নিয়ম মেনেই যাতায়াত করেন। কিন্তু বৃহস্পতিবার বিকেলে দেখা গেল এক সম্পূর্ণ বিপরীত ও অলিখিত ক্ষমতার প্রদর্শনী।
দড়ির ব্যারিকেড ও পুলিশের তৎপরতা
ডিএমপি কমিশনারের গাড়ি বহরটি যখন প্রধান ফটক দিয়ে বের হয়ে ক্রসিংয়ের সামনে আসে, তখন সেখানে নিয়োজিত পুলিশ সদস্যদের মধ্যে এক ধরনের চটজলদি তৎপরতা শুরু হয়ে যায়। সাধারণ মানুষের যাতায়াত বন্ধ রাখতে পুলিশ যে ত্রিকোণাকৃতির কোন এবং প্লাস্টিকের মোটা দড়ি দিয়ে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে রেখেছিল, তা তড়িঘড়ি করে সরিয়ে ফেলা হয়।
সরেজমিনে দেখা যায়, কমিশনারের সাদা রঙের পাজেরো গাড়ি এবং তার পেছনে থাকা নিরাপত্তারক্ষীদের বহরটি আসার ঠিক আগ মুহূর্তে রাস্তার দুই পাশে দুজন পুলিশ সদস্য পজিশন নেন। তারা লাঠি উঁচিয়ে মগবাজার ও শাহবাগগামী দুই লাইনের সব সাধারণ যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ স্তব্ধ করে দেন।
চারপাশের চাকার গতি থমকে যায়। এরপর অত্যন্ত রাজকীয় ভঙ্গিতে নির্ধারিত নিয়ম ভেঙে উল্টো দিক দিয়ে কমিশনারের গাড়িবহরটি রাস্তা পার হয়ে ওপারে চলে যায়। গাড়িগুলো পার হওয়া মাত্রই কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যরা আবার সেই দড়ির ব্যারিকেডটি টেনে যথাস্থানে বসিয়ে দেন। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের এই বিশেষ ব্যবস্থায় রাস্তাটি আবার সাধারণের জন্য বন্ধ হয়ে যায়।
ক্ষুব্ধ সাধারণ চালক ও প্রত্যক্ষদর্শীদের প্রতিক্রিয়া
পুলিশের নিজেদের তৈরি করা নিয়ম খোদ শীর্ষ কর্মকর্তার জন্য এভাবে ভেঙে ফেলার দৃশ্যটি সে সময় ওই পথে থাকা অনেক মোটরসাইকেল আরোহী ও গাড়ি চালকের নজরে আসে। দীর্ঘদিন ধরে চলা ‘ভিআইপি কালচার’ বা বিশেষ সুবিধার এই প্রকাশ্য রূপ দেখে অনেকেই ক্ষোভ ও বিরূপ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।
বর্তমানে দেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের গমনাগমনের ক্ষেত্রেও কোনো রাস্তা ব্লক বা বন্ধ না রাখার বিষয়টি পুলিশের পক্ষ থেকে বারবার প্রচার করা হচ্ছে। এমন এক সময়ে ডিএমপির নিজস্ব প্রধানের জন্য রাস্তা আটকে উল্টো পথে গাড়ি চালানোকে সাধারণ মানুষ আইনের চরম ব্যত্যয় হিসেবে দেখছেন।
ওই পথে নিয়মিত যাতায়াত করা মোটরসাইকেল চালক মেহেদি হাসান তার অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে গিয়ে বলেন, “মিন্টো রোডের এই ক্রসিংয়ে আগে স্বাভাবিক ইউটার্ন ছিল। বেশ কয়েক মাস হলো পুলিশ এটাকে ওয়ান ওয়ে করে দিয়েছে। আমাদের সাধারণ মানুষকে এখন মগবাজার মোড় ঘুরে আসতে হয়। অথচ পুলিশের বড় স্যার নিজে আইন ভাঙলেন।”
‘তাহলে কি আইন সবার জন্য সমান না?’
আরেকজন ভুক্তভোগী মোটরসাইকেল আরোহী আলামিন হোসেন তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “ডিএমপি কমিশনার একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, তিনি নিরাপত্তার জন্য প্রটোকল পেতেই পারেন। কিন্তু তার জন্য রাস্তা আটকে সাধারণ মানুষকে দাঁড় করিয়ে রাখা এবং নির্ধারিত ক্রসিং খুলে দেওয়া তো কোনো নিয়মের মধ্যে পড়ে না। মুখে তারা বলেন আইন সবার জন্য সমান, কাজে তো তার উল্টো দেখছি।”
ঢাকা ট্রাফিক বিভাগের মাঠ পর্যায়ের কয়েকজন কর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের চলাচলের সময় যানজট এড়াতে এবং দ্রুত যাতায়াত নিশ্চিত করতে অনেক সময়ই তাদের এভাবে ‘বিশেষ সুবিধা’ দিতে হয়। এটিকে তারা দায়িত্বেরই অংশ মনে করেন, যদিও কাগজে-কলমে এর কোনো আইনি ভিত্তি নেই।
জনস্বাস্থ্য ও নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার শীর্ষ ব্যক্তিরাই যদি জনসমক্ষে আইন অমান্য করার এমন নজির তৈরি করেন, তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে আইন মানার প্রবণতা কমে যায়। এটি পুলিশের নৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করে দেয় এবং সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভের সঞ্চার করে।
বৈষম্যহীন সমাজ গঠনে বড় অন্তরায়
বর্তমান সরকারের মূল স্লোগানই হলো বৈষম্যহীন ও সমঅধিকারের রাষ্ট্র গঠন করা। বিগত দিনে ভিআইপিদের উল্টো পথে চলা এবং রাস্তা আটকে সাধারণ মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে বসিয়ে রাখার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে ব্যাপক জনমত গড়ে উঠেছিল। কিন্তু মাঠ পর্যায়ের এই চিত্র বলছে, মানসিকতার পরিবর্তন এখনো পুরোপুরি আসেনি।
আজকের এই ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও নানা আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনের ভিডিওর সঙ্গে কমিশনারের গাড়ি পার হওয়ার দৃশ্য জুড়ে দিয়ে অনেকেই প্রশাসনের এই দ্বিমুখী নীতির সমালোচনা করছেন। সাধারণ নাগরিকেরা প্রশ্ন তুলছেন, ক্ষমতার চেয়ারে বসলেই কি নিয়মের উর্ধ্বে ওঠা যায়?
সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে মিন্টো রোডের সেই ক্রসিংটি আবার তার চেনা রূপে ফিরে গেছে। সাধারণ মানুষের মোটরসাইকেল আর গাড়িগুলো এখনো নিয়ম মেনে মগবাজার মোড় ঘুরে ঘুরে ডিএমপি অফিসের দিকে যাচ্ছে। আর ওপাশে, পুলিশের দড়ির ব্যারিকেডটি ঠিক আগের মতোই শক্ত করে বাঁধা রয়েছে, যা কেবল বিশেষ কারও জন্যই আলগা হয়।

