উত্তরবঙ্গের প্রাণকেন্দ্র বগুড়াবাসীর দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন অবশেষে বাস্তবে রূপ নিল। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে বগুড়াকে দেশের ত্রয়োদশ সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত করার চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে সরকার। একই সাথে প্রশাসনিক গতিশীলতা আনতে এবং নাগরিক সেবা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে দেশের চার জেলায় আরও পাঁচটি নতুন উপজেলা গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার বিকেলে সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসসংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির (নিকার) ১২০তম সভায় এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। নিকার বৈঠকের এই অনুমোদন উত্তরবঙ্গসহ সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোর প্রশাসনিক মানচিত্রে এক বড় ধরনের পরিবর্তন নিয়ে এল।
বগুড়া শহরকে সিটি কর্পোরেশনে রূপান্তরের দাবি ছিল কয়েক দশকের। বাণিজ্যিক গুরুত্ব এবং ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপে পৌরসভা কাঠামো দিয়ে এই শহরের ব্যবস্থাপনা কঠিন হয়ে পড়েছিল। সরকারের এই নতুন সিদ্ধান্তের ফলে এখন থেকে আধুনিক নগর পরিকল্পনা, উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং প্রশস্ত রাস্তাঘাট নির্মাণের পথ প্রশস্ত হলো। বগুড়া নিয়ে বাংলাদেশে এখন সিটি কর্পোরেশনের সংখ্যা দাঁড়াল ১৩টিতে।
কেবল সিটি কর্পোরেশনই নয়, নিকার বৈঠকে গুরুত্ব পেয়েছে প্রান্তিক জনপদের প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টিও। বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ উপজেলাকে দ্বিখণ্ডিত করে নতুন ‘মোকামতলা’ উপজেলা গঠনের প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে। মোকামতলা আগে থেকেই উত্তরাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত, এখন পূর্ণাঙ্গ উপজেলার মর্যাদা পাওয়ায় এখানে সরকারি দপ্তরগুলোর সরাসরি সেবা পাওয়া সহজ হবে।
কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার একটি বিশাল অংশ নিয়ে ‘মাতামুহুরী’ নামে নতুন একটি উপজেলা গঠনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ভৌগোলিক বিশালত্ব এবং দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে চকরিয়ার সাধারণ মানুষের জন্য মূল প্রশাসনিক কেন্দ্রে পৌঁছানো ছিল বেশ কষ্টসাধ্য। মাতামুহুরী উপজেলা গঠনের ফলে উপকূলীয় ও নদী তীরবর্তী মানুষের প্রশাসনিক ভোগান্তি অনেকটাই কমে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সবচেয়ে বড় চমক এসেছে উত্তরাঞ্চলের জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে। সেখানে সদর উপজেলাকে পুনর্গঠন করে দুটি নতুন উপজেলা—‘রুহিয়া’ ও ‘ভুল্লী’ গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। ঠাকুরগাঁও সদরের ওপর অতিরিক্ত প্রশাসনিক চাপ কমাতে এবং সীমান্ত সংলগ্ন এই এলাকার উন্নয়নে দুটি নতুন প্রশাসনিক ইউনিট বড় ভূমিকা রাখবে। এর ফলে স্থানীয় পর্যায় থেকে জাতীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তদারকি করা আরও সহজতর হবে।
দক্ষিণাঞ্চলেও প্রশাসনিক সংস্কারের ছোঁয়া লেগেছে। লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলাকে ভাগ করে ‘চন্দ্রগঞ্জ’ নামে নতুন একটি উপজেলা গঠন করা হয়েছে। শিল্প ও ব্যবসার প্রসারের কারণে চন্দ্রগঞ্জ এলাকাটি দীর্ঘদিন ধরেই উপজেলার দাবি জানিয়ে আসছিল। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে লক্ষ্মীপুরের মানুষের দীর্ঘদিনের একটি প্রশাসনিক আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটল।
নতুন এই পাঁচটি উপজেলা যুক্ত হওয়ায় বাংলাদেশে এখন মোট উপজেলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫০০টিতে। সরকারের এই পদক্ষেপকে অনেকেই দেখছেন ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং তৃণমূল পর্যায়ে উন্নয়নকে ছড়িয়ে দেওয়ার একটি বলিষ্ঠ পদক্ষেপ হিসেবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত এই কমিটি মনে করে, ছোট ছোট প্রশাসনিক ইউনিটের মাধ্যমে নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা অনেক বেশি ফলপ্রসূ।
নিকার বৈঠক শেষে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বগুড়া সিটি কর্পোরেশনের আয়তন এবং সীমানা নির্ধারণের কাজ এখন দ্রুততম সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করা হবে। বর্তমান পৌরসভার সাথে আশেপাশের কয়েকটি ইউনিয়ন বা জনপদ যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে করে বগুড়া শহর কেবল নামেই নয়, আয়তন ও সক্ষমতার দিক থেকেও একটি মেগাসিটিতে পরিণত হওয়ার পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নতুন উপজেলা গঠনের ফলে কেবল অফিস-আদালত বাড়বে না, বরং সেখানে নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য বিশেষ বরাদ্দ আসবে এবং কৃষি ও ব্যবসার প্রসারে সরকারি কর্মকর্তাদের সরাসরি নজরদারি বাড়বে। তবে এই নতুন উপজেলাগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও লোকবল নিয়োগ এখন সরকারের জন্য পরবর্তী বড় চ্যালেঞ্জ।
বগুড়াকে সিটি কর্পোরেশন করার ঘোষণার পর উত্তরবঙ্গের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে এক নতুন প্রাণচাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, সিটি কর্পোরেশন হওয়ার ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এখন বগুড়ার প্রতি আরও বেশি আগ্রহী হবেন। বিশেষ করে গ্যাস সংযোগ এবং উন্নত যাতায়াত ব্যবস্থার সাথে সিটি কর্পোরেশনের তকমা বগুড়াকে একটি পূর্ণাঙ্গ ইন্ডাস্ট্রিয়াল হাবে রূপান্তর করবে।
কক্সবাজারের মাতামুহুরী উপজেলা গঠনের ফলে এই পর্যটন জেলাটির প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ আরও সুসংহত হবে। অন্যদিকে, লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জ উপজেলা বাণিজ্যিক ও নিরাপত্তার দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি এলাকায় পরিণত হবে। ঠাকুরগাঁওয়ে রুহিয়া ও ভুল্লী উপজেলা সীমান্ত এলাকার মাদক পাচার রোধ এবং কৃষিপণ্য পরিবহনে বিশেষ সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
নিকার সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন যেন এই নতুন প্রশাসনিক ইউনিটগুলোর কার্যক্রম দ্রুত শুরু করা যায়। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, কেবল নাম পরিবর্তনের জন্য নয়, বরং মানুষ যেন সরকারি টেবিলে টেবিলে না ঘুরে ঘরের পাশেই সেবা পায়—সেটিই এই সংস্কারের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের আগে বা পরে এ ধরনের প্রশাসনিক সংস্কার সবসময়ই সাধারণ মানুষের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া ফেলে। বিশেষ করে বগুড়াকে সিটি কর্পোরেশন করা ছিল ওই অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘকালীন রাজনৈতিক দাবি। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে সরকার উত্তরবঙ্গের মানুষের কাছে একটি শক্তিশালী বার্তা দিতে সক্ষম হয়েছে।
তবে নতুন উপজেলা গঠনের ক্ষেত্রে কিছু কারিগরি ও আইনি প্রক্রিয়া এখনো বাকি রয়েছে। সীমানা নির্ধারণ এবং গেজেট প্রকাশের পর নির্বাচন কমিশন এসব এলাকায় নতুন প্রশাসনিক কাঠামোর জন্য নির্বাচনী সীমানা পুনর্নির্ধারণের কাজ শুরু করবে। এছাড়া নতুন উপজেলা কমপ্লেক্স নির্মাণের জন্য পর্যাপ্ত জমিও চিহ্নিত করতে হবে।
বগুড়া এবং নতুন পাঁচটি উপজেলার অধিবাসীদের মধ্যে এই খবরে বাঁধভাঙা আনন্দ দেখা গেছে। বিভিন্ন জায়গায় সাধারণ মানুষ আনন্দ মিছিল ও মিষ্টি বিতরণ করেছেন। তাদের মতে, ছোট উপজেলা মানেই হলো কর্মকর্তাদের সাথে সরাসরি কথা বলার সুযোগ এবং এলাকার ছোটখাটো সমস্যার দ্রুত সমাধান।
পরিশেষে, ৭ মে’র এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের প্রশাসনিক ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। বগুড়া সিটি কর্পোরেশন এবং ৫০০ উপজেলার মাইলফলক স্পর্শ করা বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার একটি নতুন স্মারক। এখন কেবল অপেক্ষা এই প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলো কাগজে-কলম থেকে বাস্তবে রূপান্তরিত হয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনার।
সরকারের এই সংস্কারমুখী চিন্তা যদি তৃণমূল পর্যায়ে স্বচ্ছতার সাথে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ গড়ার পথে এক বড় সহায়ক শক্তি হবে। বগুড়া সিটি কর্পোরেশন এখন ডানা মেলার অপেক্ষায়, আর পাঁচটি নতুন উপজেলা তাদের নিজস্ব পরিচিতি নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

