দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর জনপদে অকাল ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে প্রশাসনের প্রতি কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দুর্গত এলাকার প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের চিহ্নিত করে একটি স্বচ্ছ ও নির্ভুল তালিকা তৈরির ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন তিনি। সরকার চায়, কোনো মধ্যস্বত্বভোগী বা প্রভাবশালীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই সহায়তার অর্থ সরাসরি প্রকৃত কৃষকের হাতে পৌঁছাক।
বৃহস্পতিবার বিকেলে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ কক্ষে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের সভায় প্রধানমন্ত্রী এই নির্দেশনা প্রদান করেন। মূলত হাওর এলাকায় সাম্প্রতিক বৃষ্টির কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি এবং কৃষকদের জন্য সরকারের বিশেষ আর্থিক প্যাকেজ বণ্টন প্রক্রিয়া পর্যালোচনার জন্য এই সভার আয়োজন করা হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং থেকে পাঠানো এক বিবৃতিতে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
হাওর অঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকা মূলত বোরো ফসলের ওপর নির্ভরশীল। প্রতি বছর এই সময়ে অকাল বন্যার ঝুঁকি থাকলেও এবারের ভারী বর্ষণ অনেক কৃষকের স্বপ্ন ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। বিষয়টি আমলে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “হাওরের মানুষের কষ্ট আমি অনুধাবন করি। আমাদের প্রধান লক্ষ্য হলো প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের খুঁজে বের করা। তালিকায় যেন কোনো ভুল না থাকে এবং তা যেন সম্পূর্ণ স্বচ্ছ হয়।”
সভায় নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে চিহ্নিত প্রতিটি কৃষক পরিবারকে আগামী তিন মাস পর্যন্ত নিয়মিত আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হবে। এই সহায়তা যেন দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিতরণ শুরু হয়, সে জন্য মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের তৎপর থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী মনে করেন, সময়মতো সহায়তা না পেলে কৃষকরা পরবর্তী ফসলের জন্য প্রস্তুতি নিতে বাধাগ্রস্ত হবেন।
বৈঠকে কেবল তাৎক্ষণিক সহায়তা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী সংকটের সমাধান নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বারবার ফসলহানি ঠেকাতে ধান রোপণ এবং সংগ্রহের মৌসুমে কিছুটা পরিবর্তন আনা যায় কি না, তা নিয়ে কৃষি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিতে বলা হয়েছে। যদি ধান কাটার সময় কিছুটা এগিয়ে আনা সম্ভব হয়, তবে আগাম বন্যার হাত থেকে ফসল রক্ষা করা সহজ হবে।
এর আগে গত ২৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান হাওরবাসীর প্রতি তার সংহতি প্রকাশ করেছিলেন। সেদিনই তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করে অন্তত তিন মাস সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ সহযোগিতা দেওয়া হবে। বৃহস্পতিবারের সভাটি ছিল মূলত সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের একটি দাপ্তরিক পদক্ষেপ।
সভায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু এবং কৃষি ও মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী আমিনুর রশীদ ইয়াসিন উপস্থিত ছিলেন। তারা তাদের নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক চিত্র এবং ত্রাণ কার্যক্রমের পরিকল্পনা তুলে ধরেন। ত্রাণমন্ত্রী জানান, দুর্গত এলাকায় ইতোমধ্যে পর্যাপ্ত খাদ্যশস্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং তা বিতরণের প্রক্রিয়া চলছে।
হাওর অঞ্চলের জনপ্রতিনিধিদের মতামত নিতে সভায় বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্যকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালসহ সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ এলাকার সংসদ সদস্যরা সভায় তাদের এলাকার বাস্তব চিত্র তুলে ধরেন। তারা হাওর এলাকায় বাঁধ রক্ষা এবং টেকসই কৃষি ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেন।
সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন পাট ও বস্ত্র প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম, ড. ওসমান ফারুক, ফজলুর রহমান, লুৎফুজ্জামান বাবর, কামরুজ্জামান কামরুল, নুরুল ইসলাম, কলিম উদ্দিন মিলন ও মোহাম্মদ কয়সর আহমদ। জনপ্রতিনিধিরা প্রধানমন্ত্রীকে আশ্বস্ত করেন যে, তারা নিজ নিজ এলাকায় উপস্থিত থেকে স্বচ্ছ তালিকা প্রণয়নে প্রশাসনকে পূর্ণ সহযোগিতা করবেন।
প্রধানমন্ত্রী কর্মকর্তাদের সতর্ক করে দিয়ে বলেন, সহায়তার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করা নিয়ে কোনো ধরনের অনিয়ম বা স্বজনপ্রীতি বরদাস্ত করা হবে না। স্থানীয় প্রশাসনকে জনপ্রতিনিধিদের সাথে সমন্বয় করে গ্রাম পর্যায়ে গিয়ে তালিকা যাচাই-বাছাই করার নির্দেশ দেন তিনি। এতে করে প্রকৃত কৃষক যারা হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে ফসল বুনেছিলেন, তারাই সরকারি এই সুবিধা পাবেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হাওর অঞ্চলের অর্থনীতি মূলত একক ফসল নির্ভর হওয়ায় সেখানে একটি ফসল নষ্ট হওয়া মানে পুরো বছরের জন্য একটি পরিবার নিঃস্ব হয়ে যাওয়া। সরকারের পক্ষ থেকে তিন মাসের এই আর্থিক সহায়তা কৃষকদের পুনরায় ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করবে। বিশেষ করে ঋণের বোঝা মেটানো এবং পরবর্তী আমন বা বোরো মৌসুমের বীজ সংগ্রহের জন্য এই অর্থ অত্যন্ত কার্যকর হবে।
তবে মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা অনেক সময় জটিল হয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, খাস জমি বা ইজারা নেওয়া জমিতে যারা প্রকৃত চাষাবাদ করেন, কাগজে-কলমে তাদের নাম থাকে না। প্রধানমন্ত্রী এই বিষয়টি মাথায় রেখে জমির মালিকের বদলে ‘প্রকৃত চাষী’ বা ভাগচাষীদেরও যেন তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়, সেই ইঙ্গিত দিয়েছেন। মানবিক এই দৃষ্টিভঙ্গি হাওরের সাধারণ কৃষকদের মনে আশার সঞ্চার করেছে।
বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অসময়ে বৃষ্টি ও বন্যার প্রকোপ বাড়ছে। এ অবস্থায় কৃষি প্রযুক্তিতে পরিবর্তন আনা এবং পানি সহনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন নিয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়কে বিশেষ গবেষণা চালিয়ে যাওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমরা ঠেকাতে পারব না, কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা থাকলে ক্ষয়ক্ষতি অবশ্যই কমিয়ে আনা সম্ভব।
তারেক রহমানের এই ব্যক্তিগত তদারকি এবং স্বচ্ছতার ওপর জোর দেওয়াকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন কৃষি অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, অতীতে অনেক সময় রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে প্রকৃত কৃষকরা বঞ্চিত হয়েছেন। এবার যদি ডিজিটাল ডাটাবেজ ব্যবহার করে এবং স্থানীয়দের অংশগ্রহণে তালিকা করা হয়, তবে তা একটি উদাহরণ হয়ে থাকবে।
বিকেলের এই দীর্ঘ সভায় হাওর এলাকার বাঁধ নির্মাণের বর্তমান অবস্থা নিয়েও কথা হয়। বৃষ্টির পানি বাড়ার আগেই পানি উন্নয়ন বোর্ডকে বাঁধগুলোর স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের অগ্রাধিকার তালিকার শীর্ষে।
বোরো ধান সংগ্রহ শেষ না হওয়া পর্যন্ত হাওরবাসীকে বিশেষ নজরদারিতে রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কৃষি উপকরণ যেমন সার ও বীজ যেন সংকটে না পড়ে, সে বিষয়েও ডিলারদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। সরকার মনে করে, কৃষি সচল থাকলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি সচল থাকবে।
শেষ পর্যন্ত, প্রধানমন্ত্রীর এই নির্দেশনা কেবল একটি দাপ্তরিক আদেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে যেন দ্রুত মাঠ পর্যায়ে দৃশ্যমান হয়, সেটাই এখন হাওরবাসীর প্রত্যাশা। খোলা আকাশের নিচে নষ্ট হয়ে যাওয়া ফসলের দিকে তাকিয়ে থাকা হাজার হাজার কৃষকের জন্য এই আর্থিক সহায়তা হতে পারে জীবনের নতুন এক সঞ্জীবনী। ৭ মে’র এই সভাটি হাওর অঞ্চলের মানুষের জন্য একটি বিশেষ স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে।

