দেশের আকাশপথের যাত্রী ও এভিয়েশন খাতের জন্য এক বড় ধরনের স্বস্তির খবর নিয়ে এলো বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। দীর্ঘ কয়েক মাস টানা দাম বাড়ার পর অবশেষে বড় ব্যবধানে কমানো হয়েছে উড়োজাহাজের জ্বালানি বা জেট ফুয়েলের (জেট এ-১) দাম। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই দাম কমানোর ঘোষণা দেয় সংস্থাটি।
নতুন এই সিদ্ধান্তের ফলে অভ্যন্তরীণ রুটে চলাচলকারী ফ্লাইটের জন্য প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের দাম আগের তুলনায় প্রায় ২২ টাকা কমানো হয়েছে। বিইআরসি জানিয়েছে, অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের ক্ষেত্রে প্রতি লিটার জ্বালানির দাম ২২৭ টাকা ৮ পয়সা থেকে কমিয়ে ২০৫ টাকা ৪৫ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ, প্রতি লিটারে দাম কমেছে ২১ টাকা ৬৩ পয়সা।
কেবল অভ্যন্তরীণ রুটেই নয়, আন্তর্জাতিক রুটের ফ্লাইটের ক্ষেত্রেও জ্বালানি তেলের দামে বড় ধরনের সমন্বয় করা হয়েছে। বিইআরসির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের জন্য প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের দাম ১ দশমিক ৪৮০৬ ডলার থেকে কমিয়ে ১ দশমিক ৩৩৮৫ ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশ্ববাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এই দাম সমন্বয় করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দেশের এভিয়েশন খাতের সংশ্লিষ্টরা এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, গত কয়েক মাসে যেভাবে জ্বালানির দাম বাড়ছিল, তাতে এয়ারলাইন্সগুলোর পরিচালনা ব্যয় আকাশচুম্বী হয়ে পড়েছিল। এর ফলে সাধারণ যাত্রীদের টিকিটের দামও পাল্লা দিয়ে বেড়েছিল। এখন জ্বালানির দাম কমায় টিকিটের মূল্যে তার প্রভাব পড়বে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
তবে এই স্বস্তির খবরের পেছনে গত কয়েক মাসের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা ভুলে যাননি খাত সংশ্লিষ্টরা। চলতি বছরের শুরু থেকেই জেট ফুয়েলের বাজারে অস্থিরতা বিরাজ করছিল। গত এপ্রিলেই এক দফায় বড় অংকের দাম বাড়িয়েছিল বিইআরসি। ৭ এপ্রিল অভ্যন্তরীণ রুটে প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের দাম ২০২ টাকা ২৯ পয়সা থেকে এক লাফে ২২৭ টাকা ৮ পয়সা করা হয়েছিল।
তারও আগে মার্চের শেষ দিকে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছিল। ২৪ মার্চ অভ্যন্তরীণ রুটে প্রতি লিটার জ্বালানির দাম ১১২ টাকা ৪১ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২০২ টাকা ২৯ পয়সা করা হয়। অর্থাৎ মাত্র এক মাসের ব্যবধানে দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছিল। সেই তুলনায় বর্তমানের ২১ টাকা কমানোকে অনেকে পর্যাপ্ত মনে করছেন না।
জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত জেট ফুয়েলের দামের গ্রাফ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি ছিল এক অস্থির সময়ের প্রতিচ্ছবি। জানুয়ারিতে লিটার প্রতি দাম ছিল ৯৪ টাকা ৯৩ পয়সা। ফেব্রুয়ারিতে তা সামান্য বেড়ে ৯৫ টাকা ১২ পয়সা হয়। কিন্তু মার্চ মাস থেকে দামের উল্লম্ফন শুরু হয়, যা এপ্রিলে এসে চরমে পৌঁছায়।
জ্বালানির এই লাগামহীন দামের কারণে অনেক এয়ারলাইন্স তাদের অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের সংখ্যা কমিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছিল। পর্যটন নগরী কক্সবাজার বা সিলেটের রুটে সাধারণ মানুষের যাতায়াত অনেক কমে গিয়েছিল। টিকিটের চড়া দামের কারণে আকাশপথের পরিবর্তে ট্রেন বা বাসে যাতায়াত করতে দেখা যাচ্ছিল অনেক নিয়মিত যাত্রীকেও।
বিইআরসি সাধারণত আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতি মাসেই জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ করে থাকে। তবে এবারের দাম কমানোর পেছনে স্থানীয় বাজারের চাহিদা এবং আন্তর্জাতিক তেলের বাজারের নিম্নমুখী প্রবণতা কাজ করেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে দেশের এভিয়েশন সেক্টর আবার প্রাণ ফিরে পাবে।
এয়ারলাইন্স প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জেট ফুয়েল একটি ফ্লাইটের মোট পরিচালনা ব্যয়ের প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ দখল করে থাকে। তাই জ্বালানির দাম কমলে সরাসরি তার সুফল পাওয়ার কথা যাত্রীদের। তবে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, দাম বাড়লে টিকিটের দাম দ্রুত বাড়ানো হলেও কমার ক্ষেত্রে এয়ারলাইন্সগুলো কিছুটা ধীরগতিতে চলে।
কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশ (ক্যাব) এর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিইআরসি দাম কমানোর যে সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তার প্রতিফলন যেন সাধারণ মানুষের পকেটে পড়ে। বিশেষ করে আসন্ন ছুটির মৌসুমে যাত্রীদের ওপর থেকে বাড়তি ভাড়ার চাপ কমাতে এয়ারলাইন্সগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক রুটেও এই দাম কমানোর প্রভাব পড়বে। বর্তমানে ঢাকা থেকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গন্তব্যের ভাড়া আগের চেয়ে অনেক বেশি। জ্বালানি খরচ কমলে আন্তর্জাতিক ট্রাভেল এজেন্সিগুলোও তাদের প্যাকেজে পরিবর্তন আনতে পারবে। বিশেষ করে প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য এই সিদ্ধান্ত কিছুটা হলেও সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে এই নতুন দাম ঘোষণার পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়েও কথা উঠেছে। অনেক সময় ডিলার পর্যায়ে তেলের মজুত থাকলেও নতুন দাম কার্যকরে গড়িমসি করা হয়। বিইআরসি তাদের বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, এই নতুন মূল্য অবিলম্বে কার্যকর হবে এবং কোনো ধরনের অনিয়ম বরদাস্ত করা হবে না।
দেশের বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলোর মালিকরা বলছেন, জেট ফুয়েলের দাম কমলে তারা নতুন করে ফ্লাইট বাড়ানোর পরিকল্পনা করতে পারবেন। গত কয়েক মাস লোকসান দিয়ে অনেক রুট সচল রাখতে হয়েছিল। এখন দাম কমার ফলে কিছুটা হলেও আর্থিক স্থিতিশীলতা ফিরবে এবং নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে।
সাধারণ যাত্রীদের প্রতিক্রিয়া মিশ্র। আকাশপথে নিয়মিত যাতায়াত করা একজন যাত্রী জানান, ২২ টাকা কমানো ভালো উদ্যোগ, কিন্তু গত তিন মাসে যে একশ টাকার বেশি বাড়ানো হয়েছিল, সেই তুলনায় এটি অনেক কম। সরকার যদি দাম আরও স্থিতিশীল রাখতে পারে, তবেই মানুষ আবার আকাশপথে যাতায়াতে স্বস্তি বোধ করবে।
পরিশেষে, বিইআরসির এই সিদ্ধান্ত কেবল একটি গাণিতিক পরিবর্তন নয়, বরং এটি দেশের এভিয়েশন খাতের মেরুদণ্ড সোজা করার একটি চেষ্টা। যখন বিশ্বজুড়ে জ্বালানির বাজারে অস্থিরতা চলছে, তখন বাংলাদেশে দাম কমানোর এই বার্তা বিনিয়োগকারীদের মনেও সাহস জোগাবে। ৭ মে’র এই বিজ্ঞপ্তিটি কেবল এভিয়েশন খাতের জন্য নয়, বরং দেশের পর্যটন ও যাতায়াত ব্যবস্থার জন্য এক নতুন আশার নাম।
আকাশপথ কেবল উচ্চবিত্তের নয়, বরং আধুনিক যোগাযোগের একটি প্রয়োজনীয় মাধ্যম হিসেবে গড়ে উঠুক—এটাই সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা। আর সেই লক্ষ্য অর্জনে জেট ফুয়েলের মতো মৌলিক জ্বালানির দাম সহনীয় পর্যায়ে থাকাটা অপরিহার্য। সামনের দিনগুলোতে জ্বালানির বাজার কতটা স্থিতিশীল থাকে, তার ওপরই নির্ভর করছে বাংলাদেশের ডানা মেলার সক্ষমতা।

