দেশের ক্রমবর্ধমান জনস্বাস্থ্য সংকট এবং আঞ্চলিক রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য নাহিদ ইসলাম। বৃহস্পতিবার বন্দরনগরী চট্টগ্রামে আয়োজিত এক রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, অবহেলা বা চিকিৎসার অভাবে দেশে হামে আক্রান্ত হয়ে আর একটি শিশুর মৃত্যুও মেনে নেওয়া হবে না।
চট্টগ্রামে এনসিপির নতুন সদস্য সংগ্রহ ও যোগদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে নাহিদ ইসলাম দেশের সাম্প্রতিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতির ওপর গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বিগত কয়েক মাসে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হামের প্রকোপ আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। শিশুদের এই মরণব্যাধি থেকে রক্ষা করা এখন রাষ্ট্রের প্রধানতম চ্যালেঞ্জ হওয়া উচিত।
নাহিদ ইসলাম সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, কেবল পরিসংখ্যান দিয়ে পরিস্থিতি বিচার করলে চলবে না। মাঠ পর্যায়ে পর্যাপ্ত প্রতিষেধক এবং উন্নত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি শিশুর জীবন রক্ষা করা সরকারের নৈতিক দায়িত্ব। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, “আমরা এমন এক বাংলাদেশ চাই, যেখানে হামের মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগে কোনো বাবা-মায়ের কোল খালি হবে না।”
স্বাস্থ্য খাতের পাশাপাশি তিনি দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি এবং বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে দীর্ঘ বক্তব্য রাখেন। নাহিদ ইসলামের মতে, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন ও গণতান্ত্রিক পরিবেশের অন্যতম লক্ষ্য হলো বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সংখ্যালঘুদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্ব দরবারে প্রতিষ্ঠিত করা।
তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন, ধর্ম বা বর্ণ কোনো মানুষের পরিচয় হতে পারে না; নাগরিক হিসেবে সমান অধিকার নিশ্চিত করাই হলো প্রকৃত গণতন্ত্র। বাংলাদেশ এমন এক পরিবেশ গড়ে তুলতে কাজ করছে যেখানে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান—সবাই নির্ভয়ে তাদের নিজ নিজ ধর্ম পালন করতে পারবেন। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বলয় সবার জন্য সমান হবে।
বক্তব্যের এক পর্যায়ে তিনি প্রতিবেশী ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের প্রসঙ্গটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে টেনে আনেন। যদিও তিনি একে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে অভিহিত করেছেন, তবে এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করতে ভুলেননি। তিনি বলেন, সেখানে কয়েক লাখ মুসলমান ও মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষ ভোটাধিকার বঞ্চিত হয়েছেন বলে যে অভিযোগ উঠেছে, তা অত্যন্ত সংবেদনশীল।
নাহিদ ইসলাম মনে করেন, সীমান্তের ওপারে কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের ওপর অবিচার হলে তার একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব বাংলাদেশেও পড়ার সম্ভাবনা থাকে। আর এই সুযোগটিই নিতে চায় বাংলাদেশবিরোধী অপশক্তিগুলো। তারা সীমান্তপারের ঘটনাকে পুঁজি করে এ দেশে সাম্প্রদায়িক উসকানি দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে।
এই ঝুঁকি মোকাবিলায় তিনি দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সাধারণ নাগরিকদের আরও বেশি সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের পর আমাদের দায়িত্ব অনেক বেড়েছে। আমাদের নিজেদের মাটিকে নিরাপদ রাখতে হবে। কোনো উসকানিতে পা দিয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করা যাবে না।”
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা কেবল সরকারের কাজ নয়, বরং এটি একটি সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং অভ্যন্তরীণ শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে এনসিপি সবসময় রাজপথে থাকবে বলেও তিনি ঘোষণা দেন।
অনুষ্ঠানে জাতীয় নাগরিক পার্টির বিভিন্ন পর্যায়ের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা একমত পোষণ করেন যে, বাংলাদেশ যখন একটি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে, তখন বিভাজনের রাজনীতি দেশের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে। জাতীয় ঐক্যই হতে পারে সব ষড়যন্ত্রের দাঁতভাঙা জবাব।
বিশেষ করে স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা নিয়ে নাহিদ ইসলাম কড়া সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় টিকার সরবরাহ কেন ব্যাহত হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখতে হবে। হামের প্রকোপ ঠেকাতে জরুরি ভিত্তিতে বিশেষ মেডিকেল টিম গঠনের প্রস্তাবও দেন তিনি।
চট্টগ্রামের এই অনুষ্ঠানে এনসিপির আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠনের বিপুল সংখ্যক কর্মী-সমর্থক আনুষ্ঠানিকভাবে দলটিতে যোগ দেন। নাহিদ ইসলাম নতুন সদস্যদের ফুল দিয়ে বরণ করে নেন। তিনি বলেন, তারুণ্যের এই স্বতঃস্ফূর্ত যোগদান প্রমাণ করে মানুষ একটি বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ চায়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নাহিদ ইসলামের এই বক্তব্য দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক স্পর্শ করেছে। প্রথমত, তিনি জনস্বাস্থ্যকে রাজনীতির মূল ধারায় নিয়ে এসেছেন। দ্বিতীয়ত, তিনি আঞ্চলিক রাজনীতির প্রভাব সম্পর্কে সচেতন থেকে দেশের অভ্যন্তরে সাম্প্রদায়িক ভারসাম্য বজায় রাখার ওপর জোর দিয়েছেন।
চট্টগ্রামের স্থানীয় বাসিন্দারাও নাহিদ ইসলামের এই সময়োপযোগী বক্তব্যকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। বিশেষ করে হামের প্রকোপ নিয়ে তার উদ্বেগ সাধারণ মানুষের মনের কথারই প্রতিফলন। তারা আশা করছেন, সংসদ সদস্য হিসেবে তিনি বিষয়টি জাতীয় সংসদে জোরালোভাবে তুলে ধরবেন এবং কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করবেন।
বিকেলে শুরু হওয়া এই অনুষ্ঠানটি চট্টগ্রামের একটি স্থানীয় অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে তিল ধারণের জায়গা ছিল না। এনসিপির কর্মী-সমর্থকদের স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে রাজপথ। অনুষ্ঠান শেষে নাহিদ ইসলাম নতুন সদস্যদের নিয়ে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার শপথ নেন।
নাহিদ ইসলাম আরও যোগ করেন যে, বাংলাদেশ আজ বিশ্ব রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। ষড়যন্ত্রকারীরা সবসময় ওত পেতে থাকে এ দেশের উন্নয়ন ও সম্প্রীতি নষ্ট করার জন্য। তাই নাগরিকদের নিজেদের মধ্যে ঐক্য সুসংহত রাখা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।
পরিশেষে, হাম মুক্ত বাংলাদেশ এবং সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্পহীন একটি নিরাপদ রাষ্ট্র গড়ার যে অঙ্গীকার নাহিদ ইসলাম চট্টগ্রামের মাটি থেকে করেছেন, তা কতটুকু বাস্তবায়িত হয়—সেটাই এখন দেখার বিষয়। তবে তার এই স্পষ্ট ও মানবিক অবস্থান রাজনৈতিক অঙ্গনে এক ইতিবাচক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
হামের টিকা কার্যক্রম জোরদার করা এবং সীমান্তের অস্থিরতার সুযোগে কেউ যেন বিশৃঙ্খলা করতে না পারে, সেজন্য গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোরও পরামর্শ দেন তিনি। চট্টগ্রামের এই কর্মসূচিটি এনসিপির জন্য একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শন হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
বক্তব্য শেষে নাহিদ ইসলাম উপস্থিত সাধারণ মানুষের সাথে মতবিনিময় করেন এবং তাদের অভাব-অভিযোগ শোনেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন যে, কেবল চট্টগ্রাম নয়, সারা দেশের অবহেলিত ও বঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায়ে তিনি আমৃত্যু সংগ্রাম করে যাবেন।

