পারস্য উপসাগরের নীল জলরাশি আবারও বারুদের গন্ধে ভারী হয়ে উঠেছে। সোমবার ভরদুপুরে হরমুজ প্রণালির প্রবেশপথে এক রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ইরানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, তেহরানের দেওয়া চূড়ান্ত সতর্কতা উপেক্ষা করে মার্কিন একটি যুদ্ধজাহাজ বিতর্কিত জলসীমায় প্রবেশের চেষ্টা করলে তারা সেটিকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। এই ঘটনার পর মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী একটি ছায়া যুদ্ধ এখন সরাসরি সংঘাতে রূপ নেওয়ার উপক্রম হয়েছে।
ইরানি বার্তা সংস্থা ফার্স নিউজ এক জরুরি বুলেটিনে জানিয়েছে, সোমবার ইরানের জাস্ক দ্বীপের অদূরে এই চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি ঘটে। মার্কিন যুদ্ধজাহাজটি যখন জাস্ক দ্বীপের কোল ঘেঁষে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির দিকে এগোচ্ছিল, ঠিক তখনই ইরানি উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়। তেহরানের দাবি, ক্ষেপণাস্ত্রটি সরাসরি লক্ষ্যবস্তুর খুব কাছ দিয়ে অতিক্রম করায় জাহাজটি দ্রুত তার গতিপথ পরিবর্তন করে পিছু হঠতে বাধ্য হয়।
তবে এই হামলার খবর ছড়ানোর পরপরই ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিবাদ ও অস্বীকৃতি জানানো হয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম এক্সিওসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পেন্টাগনের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা দাবি করেছেন, তাদের কোনো যুদ্ধজাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেনি। ওয়াশিংটন এই ঘটনাকে ইরানের একটি ‘পরিকল্পিত উস্কানি’ এবং ‘ভুল তথ্য প্রচার’ হিসেবে অভিহিত করেছে। তবে জাস্ক দ্বীপের কাছে মার্কিন নৌবাহিনীর গতিবিধি যে বৃদ্ধি পেয়েছিল, তা তারা অস্বীকার করেনি।
এই উত্তেজনার সূত্রপাত হয় সোমবার সকালেই, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি কড়া বিবৃতি দেন। ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়ে দেন, হরমুজ প্রণালিতে অবরুদ্ধ অবস্থায় থাকা বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে নিরাপত্তা দিয়ে বের করে আনতে মার্কিন নৌবাহিনী যেকোনো পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। ট্রাম্পের এই ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরান পাল্টা হুমকি দিয়ে বলে, তাদের অনুমতি ছাড়া হরমুজ প্রণালির পানিসীমায় যেকোনো অনুপ্রবেশের পরিণতি হবে ভয়াবহ।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা এই পরিস্থিতিকে গত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন। উল্লেখ্য, টানা ৪০ দিনের এক বিধ্বংসী যুদ্ধের পর গত ৮ এপ্রিল দুই দেশ একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সই করেছিল। তবে কাগজ-কলমে শান্তি ফিরলেও মাঠের চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। চুক্তি স্বাক্ষরের মাত্র ২৪ ঘণ্টার মাথায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানি বন্দরগুলোর ওপর কঠোর নৌ-অবরোধ আরোপ করে, যা তেহরানকে ক্ষুব্ধ করে তোলে।
নৌ-অবরোধের পাশাপাশি আরব সাগরে টহলরত মার্কিন বাহিনী কয়েকটি ইরানি তেলবাহী ট্যাংকার জাহাজ জব্দ করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ইরান এই পদক্ষেপকে ‘জলদস্যুতা’ হিসেবে বর্ণনা করে আসছিল। এই সংকট নিরসনে গত ১২ এপ্রিল পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা এক গোপন বৈঠকে বসেছিলেন। কিন্তু দীর্ঘ আলোচনার পরও কোনো সমাধান ছাড়াই সেই বৈঠক শেষ হয়।
ইসলামাবাদ বৈঠকের ব্যর্থতা মূলত আজকের এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পটভূমি তৈরি করেছে। ইরানের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জাস্ক দ্বীপের কাছে আজকের এই সামরিক শক্তি প্রদর্শন আসলে ওয়াশিংটনের প্রতি একটি কঠোর বার্তা। তারা বোঝাতে চায় যে, কূটনৈতিক টেবিলে দাবি মানা না হলে পারস্য উপসাগরের ওপর মার্কিন নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা সম্ভব হবে না। অন্যদিকে, মার্কিন প্রশাসন তাদের নৌ-অবরোধ তুলে নিতে নারাজ।
হরমুজ প্রণালি বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক অপরিহার্য ধমনী। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের এক-পঞ্চমাংশ এই সরু জলপথ দিয়েই পার হয়। ফলে এখানে সামান্য বিশৃঙ্খলাও বিশ্ববাজারে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। সোমবারের এই ঘটনার পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ইতোমধ্যেই উর্ধ্বমুখী হতে শুরু করেছে। বাণিজ্যিক জাহাজগুলো এখন এই রুট ব্যবহারে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।
জাস্ক দ্বীপের অবস্থানটি ভৌগোলিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখান থেকে ইরান খুব সহজেই পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগরের সংযোগস্থল পর্যবেক্ষণ করতে পারে। সোমবারের হামলার পর আইআরজিসি (ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর) ওই এলাকায় তাদের নজরদারি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। স্থানীয় জেলেরা জানিয়েছেন, সাগরে এখন ইরানি গানবোটের সংখ্যা আগের চেয়ে অনেক বেশি দেখা যাচ্ছে।
হোয়াইট হাউজ এখন পর্যন্ত পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে পরিষ্কার কিছু জানায়নি। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধংদেহী মনোভাব এবং ইরানের অনমনীয় অবস্থান দুই দেশকে একটি অনিয়ন্ত্রিত সংঘাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। রিপাবলিকান শিবিরের অনেক নেতা মনে করছেন, ইরানের এই স্পর্ধার জবাব সামরিকভাবেই দেওয়া উচিত। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটরা চাইছেন কূটনীতির মাধ্যমে পরিস্থিতি শান্ত করতে।
তেহরানের রাজপথে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। অর্থনৈতিক অবরোধের যাঁতাকলে পিষ্ট ইরানীরা যেমন যুদ্ধের হাত থেকে মুক্তি চান, তেমনি রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে তারা আপসহীন। সোমবার বিকেলে তেহরানে এক সংক্ষিপ্ত সংবাদ সম্মেলনে ইরানের একজন সামরিক মুখপাত্র বলেন, “আমরা কোনো যুদ্ধ শুরু করতে চাই না, কিন্তু আমাদের আঙিনায় কেউ অনধিকার প্রবেশ করলে আমরা হাত গুটিয়ে বসে থাকব না।”
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশগুলোও এই পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত আশঙ্কা করছে যে, বড় ধরনের যুদ্ধ শুরু হলে তাদের তেল স্থাপনাগুলো সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে। রিয়াদ ও আবুধাবি থেকে ওয়াশিংটনকে সংযত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বলে বিভিন্ন কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে।
যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি কেন ব্যর্থ হলো, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, ৮ এপ্রিলের সেই চুক্তিটি ছিল অত্যন্ত দুর্বল এবং তাতে মূল সমস্যাগুলোর কোনো সমাধান ছিল না। বিশেষ করে পরমাণু কর্মসূচি ও ব্যালেস্টিক মিসাইল নিয়ে কোনো স্পষ্ট নির্দেশনা না থাকায় দুই দেশই নিজেদের মতো করে চুক্তির ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, তারা কেবল ‘শান্তিপূর্ণ চলাচলের অধিকার’ নিশ্চিত করতে চায়। কিন্তু ইরানের মতে, মার্কিন যুদ্ধজাহাজের উপস্থিতি মানেই হলো উস্কানি। জাস্ক দ্বীপের সেই মিসাইলটি যদি সত্যিই লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানত, তবে হয়তো আজ বিশ্বজুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসত। সৌভাগ্যক্রমে তা হয়নি, তবে ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে না—এমন নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারছে না।
সামুদ্রিক নিরাপত্তাবিষয়ক সংস্থাগুলো ইতোমধ্যে রেড অ্যালার্ট জারি করেছে। তারা জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী প্রতিটি জাহাজকে এখন থেকে বিশেষ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অনেক শিপিং কোম্পানি তাদের জাহাজের রুট পরিবর্তনের কথা ভাবছে, যা বৈশ্বিক পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
ইসলামাবাদে গত মাসে যে আলোচনা শুরু হয়েছিল, সেটি পুনরায় চালু করার জন্য পাকিস্তান ও কাতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে তেহরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, আগে মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার করতে হবে। অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসন বলছে, ইরান তাদের ‘প্রক্সি ওয়ার’ বন্ধ না করা পর্যন্ত অবরোধ শিথিল করা হবে না। এই অচলাবস্থা কাটানোর কোনো সহজ পথ এই মুহূর্তে খোলা নেই।
সোমবার সন্ধ্যার দিকে ওমান সাগরে মার্কিন ড্রোন ও নজরদারি বিমানের উপস্থিতি আরও বেড়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। পেন্টাগন আনুষ্ঠানিকভাবে হামলার কথা অস্বীকার করলেও তারা তাদের সামরিক প্রস্তুতির মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে ভূ-মধ্যসাগর থেকে আরও একটি বিমানবাহী রণতরী পারস্য উপসাগরের দিকে রওয়ানা হয়েছে বলে কিছু সূত্রে জানা গেছে।
আন্তর্জাতিক মহলে এখন একটাই প্রশ্ন—এই উত্তেজনা কি শেষ পর্যন্ত বড় কোনো বিস্ফোরণে রূপ নেবে? যদি সত্যিই কোনো মার্কিন জাহাজে ইরানি মিসাইল আঘাত হানে, তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জবাব কেমন হবে, তা সহজেই অনুমেয়। গত ৪০ দিনের যুদ্ধে যে পরিমাণ প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার ক্ষত এখনো শুকায়নি। নতুন করে যুদ্ধ মানেই হলো পুরো অঞ্চলকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া।
মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকটময় পরিস্থিতিতে জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন উভয় পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে। তবে কোনো পক্ষই এখন পর্যন্ত নমনীয় হওয়ার লক্ষণ দেখায়নি। সোমবারের এই ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ঘটনাটি কেবল একটি সামরিক পদক্ষেপ নয়, এটি একটি চরম রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
জাস্ক দ্বীপের সেই জলসীমায় এখন কেবল মৃত্যুর নিস্তব্ধতা আর শঙ্কা। যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের সমৃদ্ধি বয়ে চলে, সেই পথটিই এখন বারুদের ভাণ্ডারে পরিণত হয়েছে। সোমবারের এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং ওয়াশিংটনের অস্বীকার—এই দুইয়ের মাঝে লুকিয়ে আছে এক ভয়ানক অনিশ্চয়তা। ইতিহাসের পাতায় ৪ মে তারিখটি হয়তো আরও একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের প্রারম্ভিকা হিসেবে লেখা থাকবে।
শেষ পর্যন্ত ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ঘোষণা অনুযায়ী জাহাজগুলোকে বের করে আনতে পারেন কি না এবং ইরান তার জলসীমা রক্ষায় কতটা কঠোর থাকে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। তবে এটা নিশ্চিত যে, আজকের এই ঘটনার পর মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রে শান্তির রেখাটি আরও একবার ফিকে হয়ে গেল। বিশ্ববাসী এখন উৎকণ্ঠা নিয়ে তাকিয়ে আছে ওয়াশিংটন আর তেহরানের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।
পারস্য উপসাগরের এই ঢেউ কবে শান্ত হবে, তা কারোরই জানা নেই। তবে আপাতত হরমুজ প্রণালি হয়ে উঠেছে বিশ্বের সবচেয়ে অনিরাপদ জলপথ। প্রতিটি মুহূর্ত সেখানে এখন এক একটি যুদ্ধের সমান। এই উত্তেজনার ইতি না ঘটলে কেবল দুই দেশ নয়, বরং পুরো বিশ্বকেই এর চরম মূল্য দিতে হতে পারে।

