সুদীর্ঘ দেড় দশকের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, অগণিত ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগ এবং অসহনীয় যন্ত্রণার বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে ‘নতুন বাংলাদেশ’। এই পরিবর্তনকে পুঁজি করে দেশ পুনর্গঠনের যে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে, সেখানে সুস্থ ধারার বিতর্ক স্বাগত জানালেও মিথ্যা ও অপপ্রচারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
শনিবার রাজধানীর শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তিনি দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও সংবিধান সংস্কার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন। তার কণ্ঠে ছিল একইসঙ্গে অর্জনের গর্ব এবং ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সতর্কতা।
মির্জা ফখরুল বলেন, দীর্ঘ ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে আমরা যে লড়াই করেছি, তাতে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছে আমাদের সন্তানদের রক্তে। সেই রক্তের ঋণে আজ আমরা একটা সুযোগ পেয়েছি। এই সুযোগ হলো বাংলাদেশকে নতুন করে, আধুনিক ও বাসযোগ্য করে গড়ে তোলার।
জুলাই সনদ এবং সংবিধানের সংস্কার প্রশ্নে বর্তমানে চলমান বিতর্ক নিয়ে মন্ত্রী তার স্পষ্ট অবস্থান ব্যক্ত করেন। তিনি মনে করেন, যে কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মতভেদ এবং তর্ক-বিতর্ক থাকা স্বাভাবিক ও ইতিবাচক। কিন্তু সেই বিতর্ক যখন রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য অপপ্রচারে রূপ নেয়, তখন তা জাতির জন্য হুমকিস্বরূপ।
তিনি বলেন, “তর্ক-বিতর্ক অবশ্যই ভালো, এটি গণতন্ত্রের প্রাণ। কিন্তু যখন উদ্দেশ্যমূলকভাবে মিথ্যাচার করা হয় কিংবা রাজনৈতিক স্বার্থে কোনো বিষয়কে বিকৃত করা হয়, সেটি কখনোই কল্যাণকর হতে পারে না।”
বক্তব্যের এক পর্যায়ে ‘জুলাই সনদ’ প্রণয়নের প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন তিনি। মির্জা ফখরুল জানান, এই সনদের প্রতিটি ধাপে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। তিনি এবং দলের অন্যতম সিনিয়র নেতা সালাউদ্দিন আহমেদ নিজে স্বাক্ষর করেছেন এবং ড্রাফট তৈরির কাজেও সরাসরি যুক্ত ছিলেন।
তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, আলোচনার টেবিলে সব বিষয়ে একমত হওয়া জরুরি নয়। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ভিন্নমত বা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে এবং তারা সেই পথই বেছে নিয়েছিলেন। এ বিষয়ে আগেই সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জনগণকে জানানো হয়েছিল।
তবে কিছু বিষয়ে দ্বিমত থাকা সত্ত্বেও সেগুলোকে যেভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, তা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন মন্ত্রী। বিশেষ করে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন নিয়ে তাদের আপত্তির কথা তিনি পুনরায় স্মরণ করিয়ে দেন।
মন্ত্রী বলেন, “আমরা স্পষ্ট বলেছিলাম যে, নির্বাচনের পর নির্বাচিত সদস্যরাই সংসদ গঠন করবেন এবং তারাই সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধন বা পরিবর্তন আনবেন। কারণ এটিই সংসদীয় গণতন্ত্রের রীতি। কিন্তু এখন সেই অবস্থানকে কেন্দ্র করে ভিত্তিহীন অভিযোগ তোলা হচ্ছে।”
তার মতে, একটি বিশেষ গোষ্ঠী রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। জুলাই সনদের প্রকৃত চেতনাকে আড়াল করে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হচ্ছে, যা নতুন বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
তিনি উপস্থিত সুধী সমাজ ও তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশ্যে বলেন, অপপ্রচারের জাল ছিঁড়ে সত্যকে ধারণ করতে হবে। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর যে স্বাধীনতা ও পরিবর্তনের স্বাদ আমরা পেয়েছি, তাকে রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের সবার।
আলোচনা সভায় তিনি আরও যোগ করেন যে, সংস্কারের নামে কোনো বিশেষ এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে দেওয়া হবে না। জনগণের ম্যান্ডেট ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ কোনো রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়াটা গণতন্ত্রের জন্য শুভ নয়।
শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সভায় মন্ত্রীর বক্তব্য ছিল অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ। একদিকে তিনি যেমন অতীত সংগ্রামের চিত্র তুলে ধরেন, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের প্রশাসনিক ও সাংবিধানিক রূপরেখা নিয়েও তার দলের দর্শন তুলে ধরেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মির্জা ফখরুলের এই বক্তব্য বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সংবিধান সংস্কার নিয়ে যে ধোঁয়াশা তৈরির চেষ্টা চলছে, তা নিরসনে এটি একটি শক্তিশালী বার্তা হিসেবে কাজ করবে।
জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হলে স্বচ্ছতা ও সততার কোনো বিকল্প নেই। অপপ্রচার বনাম সুস্থ বিতর্কের এই লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত সত্যের জয় হবে বলেই আশাবাদ ব্যক্ত করেন মন্ত্রী।
বিকেলে সমাপ্ত হওয়া এই সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। মির্জা ফখরুলের বক্তব্যে বার বার ঘুরে এসেছে সেই সব বীরদের কথা, যাদের জীবনের বিনিময়ে আজকের এই মুক্ত বাতাস।
সবশেষে তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, কোনো অপশক্তিই বাংলাদেশের এই অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দিতে পারবে না। অপপ্রচারের জবাব দেওয়া হবে কাজের মাধ্যমে এবং সুসংহত গণতন্ত্রের মাধ্যমে।
সংবিধান, দেশ সংস্কার এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় সকল পক্ষকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি তার বক্তব্য শেষ করেন। দিনের শেষে এই বার্তাটিই প্রধান হয়ে ওঠে যে, নতুন বাংলাদেশ গড়তে হলে বিভেদ নয়, বরং সংহতি ও সত্যের পথে চলতে হবে।

