আগামীকাল পহেলা মে। বিশ্বজুড়ে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের দিন। এই বিশেষ দিনটিকে সামনে রেখে রাজধানী ঢাকার রাজনৈতিক অঙ্গন এখন উত্তপ্ত ও উৎসবমুখর। আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস উপলক্ষে এক বিশাল সমাবেশের ডাক দিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল। যেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে দিকনির্দেশনামূলক ভাষণ দেবেন দেশের প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে শুক্রবার দুপুর ২টায় এই সমাবেশ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। কেবল রাজধানী নয়, বরং সারাদেশের শ্রমজীবী মানুষের দৃষ্টি এখন এই সমাবেশের দিকে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এমন এক সময়ে এই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যখন দেশের সাধারণ মানুষ ও শ্রমিক শ্রেণি অর্থনৈতিক নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে সময় পার করছে।
সমাবেশের প্রস্তুতি এখন শেষ পর্যায়ে। বৃহস্পতিবার বিকেল থেকেই নয়াপল্টন এলাকায় এক কর্মব্যস্ত পরিবেশ লক্ষ্য করা গেছে। বাঁশ ও কাঠ দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে বিশালাকৃতির মঞ্চ, লাগানো হয়েছে মাইক। সমাবেশস্থল থেকে ফকিরাপুল মোড় এবং অন্যদিকে কাকরাইল পর্যন্ত পুরো এলাকা ছেয়ে গেছে ব্যানার, ফেস্টুন আর পোস্টারে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দিকে নজর রেখে প্রশাসনের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেছে আয়োজক সংগঠনটি।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সমাবেশে ঢাকা ও এর পার্শ্ববর্তী জেলাগুলো থেকে অন্তত ৫ লাখ মানুষের সমাগম ঘটানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বিএনপি ও শ্রমিক দলের নেতাকর্মীরা বলছেন, এটি কেবল একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়, বরং এটি সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের এক বিশাল মিলনমেলায় পরিণত হবে। রাজধানী ও এর আশেপাশের জেলাগুলো থেকে খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে সমাবেশে যোগ দেবেন হাজারো শ্রমিক।
জনসাধারণের দুর্ভোগ কমাতে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সমাবেশের দিন ফকিরাপুল থেকে কাকরাইল পর্যন্ত প্রধান সড়কটিতে সাধারণ যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকবে। বিকল্প পথ ব্যবহারের জন্য ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ ও দলীয় স্বেচ্ছাসেবক দল সমন্বয় করে কাজ করছে। তবে মানবিক দিক বিবেচনায় অ্যাম্বুলেন্সসহ সকল জরুরি সেবাবাহী যান চলাচলের জন্য বিশেষ ‘ইমার্জেন্সি লেন’ রাখা হবে বলে জানানো হয়েছে।
সমাবেশকে উৎসবমুখর করতে নেওয়া হয়েছে ব্যতিক্রমী সব উদ্যোগ। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শ্রমিক দলের সদস্য সচিব মো. বদরুল আলম সবুজ জানিয়েছেন, নারী শ্রমিকরা বর্ণিল শাড়ি পরে সমাবেশে যোগ দেবেন। অন্যদিকে পুরুষ কর্মীদের মাথায় থাকবে লাল-সবুজের ক্যাপ এবং হাতে জাতীয় ও দলীয় পতাকা। প্রচণ্ড গরমের কথা মাথায় রেখে আগতদের জন্য ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প ও ভ্রাম্যমাণ টয়লেটের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা হয়েছে।
শ্রমিকদের এই আবেগঘন পরিস্থিতির মধ্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান এক বিবৃতিতে বলেন, শিকাগোর হে মার্কেটের সেই রক্তঝরা ইতিহাস আজও আমাদের প্রেরণা দেয়। বাংলাদেশে শ্রমিক সমাজ বরাবরই অবহেলিত। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে তারা দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার মতো অবস্থায় রয়েছেন। তাদের বেঁচে থাকার লড়াই আজ আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, অতীতে অগণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় শ্রমিকদের অধিকার বারবার খর্ব করা হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবরের সেই দুঃসহ স্মৃতি আজও শ্রমিকদের মনে টাটকা, যখন হাজার হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। নজরুল ইসলাম খান মনে করেন, দুর্নীতির কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকারখানা পুনরায় চালু করা এবং শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি কাঠামো দ্রুত হালনাগাদ করা এখন সময়ের দাবি।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাবে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা যখন নাভিশ্বাস উঠছে, তখন এই মে দিবস শ্রমিকদের মনে নতুন আশার আলো সঞ্চার করবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সরকারি দফতরগুলোতে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ বৃদ্ধি এবং শিক্ষিত বেকারদের ক্রমবর্ধমান সংখ্যা নিয়ে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার ভাষণে সেসব সংকটের সমাধান ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা তুলে ধরবেন বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
১৮৮৬ সালের ১ মে দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের দাবিতে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তারই ধারাবাহিকতায় এ বছর বাংলাদেশে মে দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারিত হয়েছে— ‘সুস্থ শ্রমিক, কর্মঠ হাত; আসবে এবার নব প্রভাত’। এই নতুন ভোরের প্রত্যাশায় আগামীকাল নয়াপল্টনের রাজপথ হয়ে উঠবে শ্রমজীবী মানুষের কণ্ঠস্বর।
সব মিলিয়ে মে দিবসের এই সমাবেশকে কেন্দ্র করে রাজধানীতে এক ধরনের সাজ সাজ রব পড়ে গেছে। কেবল দলীয় কর্মী নয়, বরং সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষও অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন প্রধানমন্ত্রীর বার্তার জন্য। রাজনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এই সমাবেশ সফল করতে কাজ করে যাচ্ছে কয়েক হাজার স্বেচ্ছাসেবক। আগামীকালকের এই জমায়েত দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

