সকালটা আর দশটা দিনের মতোই শুরু হয়েছিল জ্যোতিষ চন্দ্র বর্মনের জন্য। মথরপাড়া বটতলা বাজারে নিজের ছোট চায়ের দোকানে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু দোকানে যাওয়ার আগে বাড়ির একটি নষ্ট ব্লেন্ডার মেশিন ঠিক করতে গিয়েই ঘটে গেল চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়ার মতো এক দুর্ঘটনা। বিদ্যুতের তারে স্পৃষ্ট হয়ে প্রাণ হারালেন ৩২ বছর বয়সী এই যুবক।
শনিবার সকালে গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার ঘুড়িদহ ইউনিয়নের মথরপাড়া পচাবস্তা গ্রামে এই হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে। নিহত জ্যোতিষ চন্দ্র বর্মন ওই এলাকার সুরেন্দ্র বর্মনের ছেলে। এলাকায় তিনি ‘মনা’ নামেই পরিচিত ছিলেন। বিকেলে সাঘাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহাবুব আলম সংবাদমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, শনিবার সকালে মনা নিজের ঘরে বসে ব্লেন্ডার মেশিনটি মেরামত করার চেষ্টা করছিলেন। অসাবধানতাবশত মেরামতের একপর্যায়ে শর্ট সার্কিট হলে তিনি মারাত্মকভাবে বিদ্যুতায়িত হন। দীর্ঘক্ষণ কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে পরিবারের সদস্যরা ঘরে ঢুকে তাকে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন।
তৎক্ষণাৎ তাকে উদ্ধার করে সাঘাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উদ্দেশ্যে রওনা দেন স্বজনরা। তবে ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই পথিমধ্যে তার মৃত্যু হয়। এক নিমেষেই হাসিখুশি যুবকটি পরিণত হন নিথর দেহে।
মনার মৃত্যুতে কেবল একটি প্রাণই ঝরে যায়নি, অন্ধকার নেমে এসেছে একটি পঙ্গু পরিবারের ওপর। নিহতের ফুফাতো ভাই সুমন রায় কান্নায় ভেঙে পড়ে জানান, মনা ছিলেন তার পরিবারের একমাত্র অবলম্বন। তার বাবা এবং মা—দুজনেই দীর্ঘ সময় ধরে প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী। বাবা-মায়ের ওষুধের খরচ আর সংসারের ঘানি টানতেই দিনরাত পরিশ্রম করতেন মনা।
সাঘাটা থানার ওসি মাহাবুব আলম জানান, প্রাথমিকভাবে ঘটনাটি নিছক দুর্ঘটনা হিসেবেই দেখা হচ্ছে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ না থাকায় এবং স্থানীয়দের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে আইনি প্রক্রিয়া শেষে লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
মথরপাড়া বটতলা বাজারের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা জানান, মনা ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী ও পরিশ্রমী। তার এই আকস্মিক প্রয়াণে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। প্যারালাইজড বাবা-মায়ের এখন কী হবে—এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে প্রতিবেশীদের মনে। একটি ছোট্ট ব্লেন্ডার মেরামত করার সাধারণ চেষ্টা যে এভাবে একটি পরিবারের মেরুদণ্ড ভেঙে দেবে, তা ছিল সবার কল্পনার বাইরে।
বিশেষজ্ঞরা এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে সতর্ক করে বলছেন, কারিগরি জ্ঞান ছাড়া বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ঘরে মেরামত করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সামান্য অসাবধানতা যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে, সাঘাটার এই ঘটনা তারই এক মর্মান্তিক প্রমাণ। মনার মৃত্যুতে ওই এলাকায় এখন কেবলই হাহাকার আর নিস্তব্ধতা।

