কৌশলগতভাবে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালীতে চলাচলকারী জাহাজ থেকে প্রথমবারের মতো টোল আদায়ের অর্থ হাতে পেয়েছে ইরান। দেশটির পার্লামেন্টের উপ-স্পিকার হামিদরেজা হাজিবাবেই বৃহস্পতিবার এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, টোল থেকে সংগৃহীত প্রথম কিস্তির অর্থ ইতোমধ্যেই ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে জমা হয়েছে।
ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা ‘তাসনিম নিউজ’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে উপ-স্পিকার এই অর্থমূল্য প্রাপ্তির বিষয়টি প্রকাশ্যে আনেন। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে এই জলপথে টোল আরোপের যে আলোচনা চলছিল, এই ঘটনার মধ্য দিয়ে তা পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক রূপ পেল। মূলত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের এই প্রাণকেন্দ্রের ওপর নিজেদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার এটি একটি বড় পদক্ষেপ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এদিকে, এই অর্থ প্রাপ্তির খবরের সমান্তরালে তেহরানের পক্ষ থেকে পশ্চিমাদের প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, যতক্ষণ না ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে মার্কিন নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়া হচ্ছে, ততক্ষণ এই প্রণালী সবার জন্য উন্মুক্ত করা হবে না।
গতকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বার্তায় ঘালিবাফ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বর্তমানে ইরানের ওপর জারি থাকা নৌ-অবরোধকে চলমান যুদ্ধবিরতি চুক্তির সরাসরি লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার মতে, একটি পক্ষের একতরফা অবরোধ বজায় রেখে আন্তর্জাতিক জলপথ উন্মুক্ত রাখার প্রত্যাশা করা অযৌক্তিক।
ঘালিবাফ তার বার্তায় জোর দিয়ে বলেন, “একটি কার্যকর যুদ্ধবিরতি কেবল তখনই সফল হতে পারে, যখন সব ধরণের নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার করা হবে। আন্তর্জাতিক অর্থনীতিকে জিম্মি করে কোনো সমঝোতা সম্ভব নয়।” তিনি আরও যোগ করেন যে, রণাঙ্গনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসরায়েলি বাহিনীর আগ্রাসন বন্ধ করাও এই শান্তির অন্যতম পূর্বশর্ত।
ইরানি স্পিকারের এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, তেহরান হরমুজ প্রণালীকে এখন কেবল একটি জলপথ হিসেবে নয়, বরং একটি দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। তিনি কঠোর স্বরে বলেন, “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সামরিক আগ্রাসনের মাধ্যমে যা অর্জন করতে পারেনি, অর্থনৈতিক ভয়ভীতি বা অবরোধের মাধ্যমেও তা হাসিল করতে পারবে না।”
হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের মোট তেলের চাহিদার একটি বড় অংশ পারস্য উপসাগর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছায়। গত ২৮ তারিখের পর থেকে ইরানের অভিজাত বাহিনী আইআরজিসি এই রুটে যে কড়াকড়ি আরোপ করেছে, তাতে বিপাকে পড়েছে বহু দেশ। এখন টোল আদায়ের খবরটি জাহাজ কোম্পানিগুলোর জন্য নতুন অর্থনৈতিক বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলো এই টোল প্রদানের বিষয়ে এখনো কোনো প্রকাশ্য বিবৃতি দেয়নি। তবে ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে টাকা জমা পড়ার তথ্য এটাই নির্দেশ করে যে, অন্তত কিছু পক্ষ এই জলপথ সচল রাখতে তেহরানের শর্ত মেনে নিতে শুরু করেছে। যদিও এই টোলের পরিমাণ বা কোন জাহাজ থেকে এটি আদায় করা হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত গোপন রাখা হয়েছে।
লজিস্টিক বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালীতে টোল আরোপ করার বিষয়টি আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইনের সাথে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে আইনি বিতর্ক তৈরি হতে পারে। তবে ইরান এই জলপথের নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে এবং নিজেদের পানিসীমা ব্যবহারের যুক্তি দেখিয়ে এই পদক্ষেপকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছে।
এই পুরো বিষয়টি এখন মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে। মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত তেহরান তাদের অবস্থানে অনড় থাকার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এর ফলে সামনের দিনগুলোতে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তেহরানের এই কৌশলগত জয় বা অর্থনৈতিক চালের বিপরীতে ওয়াশিংটন বা তেল আবিব কী প্রতিক্রিয়া দেখায়, এখন সেটিই দেখার বিষয়। কারণ, হরমুজ প্রণালী দীর্ঘ সময় আংশিক বা পূর্ণাঙ্গ অবরুদ্ধ থাকলে তার বিরূপ প্রভাব পড়বে ইউরোপ ও এশিয়ার বড় অর্থনীতির দেশগুলোতে।
আপাতত, টোলের প্রথম অর্থ পকেটে পুরে ইরান বিশ্বকে বার্তা দিল যে, এই অঞ্চলের সমুদ্রপথের চাবিকাঠি এখন তাদের হাতে। বাঘের ঘালিবাফের শর্ত মেনে নিয়ে পশ্চিমা বিশ্ব পিছু হটে কি না, তা আগামী কয়েক দিনের কূটনৈতিক তৎপরতার ওপর নির্ভর করছে। দাবার বোর্ডে এখন চাল দেওয়ার পালা সম্ভবত পশ্চিমাদের।

