পারস্য উপসাগরের আকাশে আবারও যুদ্ধের কালো মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে দুই পক্ষই এখন চরম অবস্থানে। ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, তাদের সেনাবাহিনীর হাত এখন ‘ট্রিগারেই আছে’। অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, কোনো চুক্তি না হলে ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা পুনরায় শুরু করতে তার সামরিক বাহিনী পুরোপুরি প্রস্তুত।
বুধবার ভোরে ইরানের খাতাম আল-আনবিয়া কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরের মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল ইব্রাহিম জুলফাগারি এক কড়া বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি চরম সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেন। মেহের নিউজের বরাতে জানা গেছে, জুলফাগারি সরাসরি মার্কিন কমান্ডো ও প্রেসিডেন্টকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, ইরানের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হানার চেষ্টা করলে তার জবাব হবে অত্যন্ত কঠোর ও দ্রুত।
ইরানি এই সেনা কর্মকর্তা দাবি করেন, সম্ভাব্য যুদ্ধের জন্য তারা ইতিমধ্যেই শত্রুপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুগুলো চিহ্নিত করে রেখেছেন। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, এবার যদি সংঘাত শুরু হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্র ইসরায়েলকে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়েও ভয়াবহ পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে। তেহরানের এই ‘ট্রিগার পলিসি’ স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, তারা কূটনৈতিক আলোচনার চেয়ে সামরিক শক্তির মহড়াকেই এখন অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
এদিকে হোয়াইট হাউস থেকেও সুর নরম করার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। সিএনবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন, ৪০ দিনের এই যুদ্ধবিরতির সময়টিকে যুক্তরাষ্ট্র বৃথা যেতে দেয়নি। বরং এই বিরতিকে তারা অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ পুনরায় মজুত করার কাজে ব্যবহার করেছে। ট্রাম্পের ভাষায়, “আমরা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী এবং আমাদের হাতে প্রচুর গোলাবারুদ রয়েছে। নির্দেশ পাওয়ামাত্রই আমরা হামলা শুরু করতে পারব।”
আগামীকালই ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হতে চলেছে। আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারী দেশ হিসেবে পাকিস্তান আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছিল দুই পক্ষকে দ্বিতীয় দফায় আলোচনার টেবিলে বসাতে। ইসলামাবাদে প্রথম দফার বৈঠক ব্যর্থ হওয়ার পর পাকিস্তান চেয়েছিল চুক্তির একটি চূড়ান্ত খসড়া তৈরি করতে। তবে ট্রাম্প চুক্তির বিষয়ে কিছুটা ইতিবাচক ইঙ্গিত দিলেও, ইরান দ্বিতীয় দফার বৈঠকে বসার ব্যাপারে এখনো রহস্যজনক নীরবতা পালন করছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য আদতে ইরানের ওপর ‘মনস্তাত্ত্বিক চাপ’ তৈরির একটি কৌশল। তিনি ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছেন যে, নতুন কোনো চুক্তি স্বাক্ষরিত না হলে তিনি আর যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়াতে রাজি নন। এর অর্থ হলো, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যদি বড় কোনো কূটনৈতিক নাটকীয়তা না ঘটে, তবে মধ্যপ্রাচ্যে আবারও বড় আকারের সামরিক সংঘাত শুরু হওয়ার প্রবল ঝুঁকি রয়েছে।
ইরানের ভেতরেও জনমত এখন বিভক্ত। একপক্ষ চাইছে আলোচনার মাধ্যমে অর্থনৈতিক অবরোধ থেকে মুক্তি পেতে, আর কট্টরপন্থীরা চাইছে যুক্তরাষ্ট্রের এই ‘আধিপত্যবাদী’ আচরণের দাঁতভাঙা জবাব দিতে। লেফটেন্যান্ট কর্নেল জুলফাগারির এই ‘ট্রিগার’ মন্তব্য মূলত সেই কট্টরপন্থী অবস্থানেরই বহিঃপ্রকাশ। তেহরান সম্ভবত বোঝাতে চাইছে যে, তারা কোনো ধরনের চাপের মুখে নতি স্বীকার করে চুক্তিতে সই করবে না।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখন বারুদের স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে ট্রাম্পের ‘সর্বোচ্চ শক্তি’ প্রয়োগের হুমকি, অন্যদিকে ইরানের ‘কঠোরতম জবাব’ দেওয়ার হুঁশিয়ারি। বিশ্ব সম্প্রদায় এখন রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় শেষ মুহূর্তের কোনো মিরাকল ঘটে কি না তা দেখতে। যদি কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়, তবে পারস্য উপসাগর আবারও আগুনের গোলকায় পরিণত হতে পারে, যার আঁচ লাগবে পুরো বিশ্ব অর্থনীতিতে।

