দীর্ঘ তেরো বছরের কঠোর সাধনা আর এক বছরের তীব্র আইনি লড়াই শেষে অবশেষে জয়ের হাসি হাসলেন তুর্কি শিক্ষার্থী রুমেইসা ওজতুর্ক। ফিলিস্তিনের পক্ষে কলম ধরায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের রোষানলে পড়েছিলেন তিনি। বাতিল করা হয়েছিল ভিসা, পাঠানো হয়েছিল ডিটেনশন সেন্টারে। তবে পিছু হটেননি এই লড়াকু গবেষক। ট্রাম্প প্রশাসনকে আইনি লড়াইয়ে পরাজিত করে সফলভাবে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে তিনি এখন নিজ দেশ তুরস্কে।
ঘটনার সূত্রপাত ২০২৪ সালের মার্চ মাসে। যুক্তরাষ্ট্রের টাফটস বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রুমেইসা ওজতুর্কসহ চারজন শিক্ষার্থী মিলে ‘টাফটস ডেইলি’ পত্রিকায় একটি নিবন্ধ লেখেন। সেখানে তারা ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলি সামরিক অভিযানকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে উল্লেখ করেন এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে তা স্বীকার করে নেওয়ার আহ্বান জানান। এই একটি লেখাই তার শিক্ষাজীবনে কালবৈশাখী ঝড় বয়ে আনে।
ট্রাম্প প্রশাসন এই নিবন্ধটিকে কেন্দ্র করে রুমেইসার বিরুদ্ধে ‘ইহুদিবিদ্বেষী’ প্রচারণার অভিযোগ তোলে। অভিযোগটি এতটাই গুরুতর পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয় যে, গত বছর তার আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভিসা বাতিল করে দেয় মার্কিন অভিবাসন বিভাগ। পরিস্থিতির অবনতি ঘটে যখন গত বছরের মার্চে ম্যাসাচুসেটস থেকে তাকে আটক করে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) কর্মকর্তারা। তাকে লুইজিয়ানার একটি নির্জন ডিটেনশন সেন্টারে বন্দী করে রাখা হয়।
কারাগারের চার দেয়ালও রুমেইসার জ্ঞানপিপাসু মনকে দমাতে পারেনি। সেখান থেকেই শুরু হয় এক অসম লড়াই। একদিকে বিশাল ক্ষমতাধর মার্কিন সরকার, অন্যদিকে একজন বিদেশী শিক্ষার্থী। তবে রুমেইসার পাশে দাঁড়ায় ম্যাসাচুসেটসের আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়ন (এসিএলইউ)। দীর্ঘ শুনানিতে উঠে আসে যে, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর কোনো শক্তিশালী আইনি ভিত্তি নেই।
চলতি বছরের এপ্রিলে এই আইনি নাটকের পরিসমাপ্তি ঘটে। মার্কিন সরকার এবং ওজতুর্কের মধ্যে একটি সমঝোতা হয়, যেখানে সরকার তার বিরুদ্ধে আনা ইমিগ্রেশন মামলাটি প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয়। এর ফলে তার শিক্ষার্থীর মর্যাদা পুনরায় ফিরিয়ে দেওয়া হয়। আইনি জটিলতা কাটিয়ে ওঠার পরপরই তিনি তার দীর্ঘ প্রতীক্ষিত পিএইচডি সম্পন্ন করেন।
বিজয়ীর বেশে তুরস্কে ফিরে রুমেইসা ওজতুর্ক এক আবেগঘন বিবৃতি দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘১৩ বছরের নিরলস পরিশ্রমের পর আমি আজ গর্বিত যে আমার পিএইচডি শেষ করতে পেরেছি। আমি কারো চাপে নয়, বরং নিজের সময়সূচি অনুযায়ী সগৌরবে দেশে ফিরতে পেরেছি।’ তবে তার এই দীর্ঘ লড়াইয়ে যে সময় নষ্ট হয়েছে, তার জন্য তিনি মার্কিন সরকারের হঠকারিতাকেই দায়ী করেছেন।
রুমেইসা আক্ষেপ করে বলেন, ‘সরকারের এই প্রতিহিংসামূলক আচরণের কারণে আমার যে মূল্যবান সময় নষ্ট হয়েছে, তা শুধু আমার ক্ষতি নয়। এটি সেইসব শিশু ও তরুণদেরও ক্ষতি, যাদের মঙ্গলের জন্য আমি কাজ করতে চেয়েছিলাম।’ পিএইচডি সম্পন্ন করা এই গবেষক এখন তুরস্কে শিশু অধ্যয়ন ও মানব উন্নয়ন বিষয়ে তার একাডেমিক ক্যারিয়ার নতুন করে সাজাতে চান।
ম্যাসাচুসেটসের এসিএলইউ-এর আইন পরিচালক জেসি রসম্যান এই জয়কে মত প্রকাশের স্বাধীনতার জয় হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, ‘ড. ওজতুর্ক একজন নিবেদিতপ্রাণ গবেষক। তাকে দমানোর জন্য বেআইনিভাবে ভিসা বাতিল করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি দমে যাননি, বরং সেই অবস্থান থেকে মানবাধিকার ও শিশুদের অধিকার নিয়ে কথা বলে গেছেন।’
মামলার নথিপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, রুমেইসার বিরুদ্ধে সরকারের কাছে সেই কলেজ পত্রিকার নিবন্ধটি ছাড়া আর কোনো প্রমাণই ছিল না। এমনকি চলতি বছরের শুরুতে একজন অভিবাসন বিচারক যখন ঘোষণা করেন যে তাকে বহিষ্কারের কোনো আইনি ভিত্তি নেই, তখন সেই বিচারককে বরখাস্ত করে ট্রাম্প প্রশাসন। এটি স্পষ্ট করে দেয় যে, পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
গত সপ্তাহে তুরস্কের মাটিতে পা রাখা রুমেইসা ওজতুর্ক এখন বিশ্বজুড়ে মুক্তমনা শিক্ষার্থীদের কাছে এক অনুপ্রেরণার নাম। ক্ষমতার দাপট যে ন্যায়ের পথে বাধা হতে পারে না, রুমেইসা তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে রইলেন। তার এই লড়াই শিক্ষা ও মত প্রকাশের অধিকার রক্ষার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে গণ্য হবে।

