পারস্য উপসাগরের রণকৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার স্নায়ুযুদ্ধ এখন এক নতুন মোড় নিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান মুখে কঠোর অবস্থান দেখালেও বাস্তবে তারা হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ সচল রাখার পক্ষেই রয়েছে। মূলত মার্কিন অবরোধের ফলে প্রতিদিন যে বিপুল পরিমাণ আর্থিক লোকসান হচ্ছে, তা কাটিয়ে উঠতেই তেহরান এই পথটি উন্মুক্ত দেখতে চায় বলে মনে করেন তিনি।
হোয়াইট হাউসের এই কঠোর অবস্থান স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে আপাতত প্রশান্তির কোনো সম্ভাবনা নেই। মঙ্গলবার যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বৃদ্ধির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসার পরপরই নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ এক দীর্ঘ বার্তায় ট্রাম্প ইরানের অভ্যন্তরীণ সংকটের কথা তুলে ধরেন। তিনি সরাসরি দাবি করেন, অর্থনৈতিক পঙ্গুত্ব থেকে বাঁচতেই ইরান এখন পর্দার আড়ালে সমঝোতার পথ খুঁজছে।
ট্রাম্পের মতে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকাটা ইরানের জন্যও স্বস্তিদায়ক নয়। প্রতিদিন এই জলপথ থেকে তেহরান প্রায় ৫০ কোটি ডলার আয়ের যে লক্ষ্যমাত্রা রাখে, মার্কিন অবরোধের কারণে তা এখন পুরোপুরি বাধাগ্রস্ত। প্রেসিডেন্ট বলেন, “আমি এই প্রণালি সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করার নির্দেশ দিয়েছি বলেই আজ তারা কোণঠাসা। এখন নিজেদের ভাবমূর্তি বা ‘মুখ বাঁচাতে’ তারা বাইরে প্রচার করছে যে তারা হরমুজ বন্ধের পক্ষে।”
গত কয়েকদিনের গোয়েন্দা তথ্য এবং কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে ট্রাম্প উল্লেখ করেন যে, ইরান এই অবরোধ তুলে নেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। মাত্র তিন থেকে চার দিন আগেই তার কাছে এমন বার্তা পৌঁছেছে যে, তেহরান দ্রুত স্বাভাবিক বাণিজ্যিক কার্যক্রমে ফিরতে চায়। তবে ট্রাম্পের বিশ্লেষণ বলছে ভিন্ন কথা; তিনি মনে করেন এখন নমনীয় হওয়া মানেই চিরস্থায়ী শান্তি চুক্তির সম্ভাবনাকে নষ্ট করা।
ট্রুথ সোশ্যালের ওই পোস্টে ট্রাম্প আরও স্পষ্ট করে বলেন, “কয়েকজন প্রতিনিধি আমার কাছে এসে অনুরোধ করেছিলেন যাতে আমি ইরানের ওপর থেকে এই কঠোর অবরোধ শিথিল করি। তারা বলেছিলেন যে ইরান দ্রুত হরমুজ থেকে সরে আসতে চায়। কিন্তু আমি তাদের পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছি, যদি আমরা এখন ছাড় দেই, তবে তেহরানকে কোনোদিনও আলোচনার টেবিলে আনা সম্ভব হবে না।”
মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই অনড় অবস্থান একটি চরম পরিণতির দিকেও ইঙ্গিত করছে। তিনি সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেছেন, যদি অবরোধের মাধ্যমে ইরানকে চুক্তিতে বাধ্য করা না যায়, তবে পরিস্থিতি সামরিক সংঘাতের দিকে মোড় নিতে পারে। তার ভাষায়, “হয় আমাদের এই চাপের নীতি বজায় রাখতে হবে, নয়তো চুক্তির পরিবেশ নিশ্চিত করতে পুরো ইরান এবং তাদের নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে চরম ব্যবস্থা নিতে হবে।”
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার এই সাম্প্রতিক অস্থিরতা মূলত শুরু হয়েছিল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে। দীর্ঘ ৪০ দিনের ছায়াযুদ্ধ এবং পাল্টাপাল্টি হামলার পর গত ৮ এপ্রিল দুই দেশ একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। উদ্দেশ্য ছিল স্থায়ী একটি শান্তি চুক্তির মাধ্যমে কয়েক দশকের পুরনো শত্রুতার অবসান ঘটানো। কিন্তু আলোচনার টেবিল যতটা সহজ ভাবা হয়েছিল, বাস্তবে তা ততটাই জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই শান্তি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গত ১১ এপ্রিল পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা বৈঠকে বসেন। দীর্ঘ ২১ ঘণ্টা ধরে রুদ্ধদ্বার বৈঠক চললেও শেষ পর্যন্ত কোনো সমঝোতা ছাড়াই তা শেষ হয়। কোনো পক্ষই তাদের মৌলিক অবস্থান থেকে এক চুলও নড়তে রাজি হয়নি। বিশেষ করে পারমাণবিক কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার নিয়ে মতপার্থক্য ঘোচানো সম্ভব হয়নি।
ইসলামাবাদ বৈঠক ব্যর্থ হওয়ার পরদিনই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অত্যন্ত কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তিনি ইরানের প্রধান সমুদ্রবন্দরগুলোসহ পুরো হরমুজ প্রণালিতে কঠোর অর্থনৈতিক ও নৌ-অবরোধ আরোপের নির্দেশ দেন। ওয়াশিংটনের যুক্তি ছিল, অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল না করলে তেহরান কখনোই আমেরিকার দেওয়া শর্ত মেনে নেবে না। এই অবরোধের ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহেও বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প এখন ‘সর্বোচ্চ চাপ’ (Maximum Pressure) প্রয়োগের নীতিতে ফিরে গেছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, ইরানের অর্থনীতি যেহেতু তেলের ওপর নির্ভরশীল, তাই হরমুজ প্রণালিকে তুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহার করে তেহরানকে কোণঠাসা করা সম্ভব। তবে ইরানের পাল্টা হুমকিও থেমে নেই; তারা বারবারই বলে আসছে যে তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত তারা মেনে নেবে না।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং চীন এই পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। এই পথে সামান্যতম বিঘ্ন ঘটলে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধস নামতে পারে। তা সত্ত্বেও ওয়াশিংটন মনে করছে, একটি টেকসই শান্তি চুক্তির জন্য এই ঝুঁকি নেওয়া ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো বিকল্প নেই।
ইসলামাবাদে যে সংলাপ শুরু হয়েছিল, তা এখন হিমাগারে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, দুই দেশের আস্থার সংকট এখন তুঙ্গে। একদিকে ট্রাম্প চাইছেন ইরানের পূর্ণ আত্মসমর্পণ, অন্যদিকে ইরান চাইছে তাদের সার্বভৌমত্ব বজায় রেখে কেবল অর্থনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত করতে। এই দুই বিপরীতমুখী অবস্থানের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আবারও যুদ্ধের ঘনঘটা দেখা দিচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সর্বশেষ বক্তব্য এটিই প্রমাণ করে যে, তিনি কেবল একটি চুক্তিতেই সন্তুষ্ট হবেন না, যদি না সেটি সম্পূর্ণভাবে আমেরিকার শর্তানুসারে হয়। ইরানের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় এই অবরোধের প্রভাব অত্যন্ত নেতিবাচক হলেও, ট্রাম্পের দৃষ্টি এখন কেবল রাজনৈতিক বিজয়ের দিকে। সামনের দিনগুলোতে হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন নৌবাহিনীর উপস্থিতি এবং ইরানের পাল্টা মহড়া পরিস্থিতিকে কোন দিকে নিয়ে যায়, সেদিকেই তাকিয়ে আছে বিশ্ব।
পেন্টাগন এবং মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরও ইঙ্গিত দিয়েছে যে, তেহরান যদি তাদের আচরণ পরিবর্তন না করে, তবে এই অবরোধ আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। ট্রাম্পের ভাষায়, “ইরান এখন সংকটে আছে এবং তারা জানে যে সময় ফুরিয়ে আসছে।” এখন দেখার বিষয়, তেহরান এই অর্থনৈতিক চাপের মুখে নতি স্বীকার করে নতুন কোনো চুক্তিতে সই করে, নাকি এই সংঘাত আরও বড় কোনো আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেয়।

