মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে জমতে থাকা বারুদের গন্ধে নতুন করে হাওয়া দিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বুধবার যখন ইসলামাবাদে প্রস্তাবিত শান্তি আলোচনার সময়সীমা শেষ হতে চলেছে, ঠিক তার আগমুহূর্তে তেহরানকে চরম হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি জানিয়েছেন—হয় চুক্তিতে আসতে হবে, নয়তো যুদ্ধের মুখোমুখি হতে হবে। মার্কিন সামরিক বাহিনী যেকোনো মুহূর্তে ইরানে পুনরায় হামলা চালানোর জন্য ‘মুখিয়ে আছে’ বলেও দম্ভোক্তি করেছেন তিনি।
মঙ্গলবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি-কে দেওয়া এক বিস্ফোরক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প স্পষ্ট করে দেন যে, গত কয়েকদিনের সাময়িক যুদ্ধবিরতিকে ওয়াশিংটন মূলত তাদের রণপ্রস্তুতি ঝালিয়ে নেওয়ার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করেছে। ট্রাম্পের ভাষায়, “আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত। আমাদের হাতে পর্যাপ্ত গোলাবারুদ ও অত্যাধুনিক সরঞ্জাম মজুত আছে। এই বিরতির সময়টাকে আমরা শক্তি সঞ্চয়ের কাজে লাগিয়েছি।” তার এই মন্তব্য থেকে এটি পরিষ্কার যে, হোয়াইট হাউস কূটনীতির চেয়ে সামরিক শক্তি প্রদর্শনেই বেশি আগ্রহী।
ট্রাম্প সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, বুধবার শেষ হতে যাওয়া যুদ্ধবিরতির মেয়াদ তিনি আর এক মুহূর্তও বাড়াতে রাজি নন। ইরানের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে কঠোর বার্তা দিয়ে তিনি বলেন, “আপনাদের হাতে খুব বেশি সময় নেই। হয় আলোচনার টেবিলে এসে একটি চুক্তিতে পৌঁছান, নয়তো ভয়াবহ পরিণতির জন্য প্রস্তুত থাকুন।” ট্রাম্পের এই অনমনীয় অবস্থান ইসলামাবাদের শান্তি প্রচেষ্টাকে কার্যত খাদের কিনারে ঠেলে দিয়েছে।
এদিকে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে আলোচনার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হলেও এখন পর্যন্ত ইরানের কোনো প্রতিনিধিদল সেখানে পৌঁছায়নি। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা বলছে, তেহরানের এই অনীহা কেবল যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আস্থার অভাব নয়, বরং এক গভীর সন্দেহ ও ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। ইরান অভিযোগ করছে যে, যুদ্ধবিরতি চলাকালীনও যুক্তরাষ্ট্র ওমান সাগরে তাদের বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়েছে এবং ক্রু সদস্যদের পরিবারসহ বন্দি করেছে। তেহরানের মতে, এক হাতে বন্দুক আর অন্য হাতে হ্যান্ডশেক—যুক্তরাষ্ট্রের এই দ্বিচারিতা আলোচনার পরিবেশ নষ্ট করেছে।
ইরানের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দেশটির গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুগুলোতে হামলার হুমকি দিয়ে ওয়াশিংটন আসলে কোনো কূটনীতি করছে না, বরং নিজেদের শর্ত চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। তেহরানের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, “হুমকির ছায়ায় কোনো অর্থবহ আলোচনা চলতে পারে না।” তারা যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক নৌ-অবরোধ ও ভারত মহাসাগরে জাহাজ জব্দ করার ঘটনাগুলোকে সরাসরি যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন হিসেবে দেখছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই ‘ম্যাক্সিমাম প্রেসার’ বা চরম চাপের নীতি ইরানকে হিতে বিপরীত প্রতিক্রিয়া দেখাতে বাধ্য করতে পারে। পাকিস্তান সরকার এই সংকট নিরসনে আপ্রাণ চেষ্টা চালালেও ট্রাম্পের সর্বশেষ এই সাক্ষাৎকার সেই চেষ্টায় জল ঢেলে দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের দাবি—ইরান যদি চুক্তিতে আসে তবেই তারা ভালো অবস্থানে থাকবে, অন্যথায় সামরিক অভিযানের বিকল্প নেই।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের কূটনৈতিক মহল এখন উৎকণ্ঠার সাথে আগামী কয়েক ঘণ্টার দিকে তাকিয়ে আছে। যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ট্রাম্প কি সত্যিই হামলার নির্দেশ দেবেন, নাকি পর্দার আড়ালের কোনো সমঝোতা এই মহাপ্রলয় রুখে দেবে? রণক্লান্ত মধ্যপ্রাচ্য এবং টালমাটাল বিশ্ব অর্থনীতি এখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরবর্তী আদেশের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত, ট্রাম্পের এই রণহুঙ্কার ও তেহরানের কঠোর নীরবতা—উভয়ই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ২০২৬-এর এই বসন্ত হয়তো বড় কোনো অগ্নিকাণ্ডের সাক্ষী হতে চলেছে।

