দক্ষিণ এশিয়ার আকাশে যখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বরফ গলার স্বপ্ন দেখা যাচ্ছে, ঠিক তখনই পশ্চিম এশিয়া থেকে ধেয়ে আসছে এক ভিন্ন মাত্রার অস্বস্তি। পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ এখন বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। শহরজুড়ে কড়া নিরাপত্তা, রেড জোন সিলগালা, আর হাজারো সেনার টহল—সবই ইশারা দিচ্ছে তেহরান ও ওয়াশিংটনের সম্ভাব্য এক ঐতিহাসিক বৈঠকের দিকে। কিন্তু এই আলোচনার টেবিলে বসার আগেই প্রশ্ন উঠছে, এই শান্তিপ্রক্রিয়া আসলে কার স্বার্থে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে?
সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণ বলছে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং দেশটির কট্টরপন্থী রাজনীতিকরা মনেপ্রাণে চাইছেন এই আলোচনা ব্যর্থ হোক। কারণ, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে যদি কোনো সমঝোতা হয়, তবে তা ইরান এবং লেবাননের হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের চলমান সামরিক অভিযানকে স্থবির করে দিতে পারে। তেল আবিবের জন্য এই মুহূর্তে শান্তি নয়, বরং যুদ্ধের ধারাবাহিকতা রক্ষা করাই রাজনৈতিকভাবে লাভজনক বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় বর্তমানে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চলছে। তবে ইসরায়েলি সরকারের অন্দরে এই পরিস্থিতি নিয়ে চরম অসন্তোষ বিরাজমান। তারা শুরু থেকেই দাবি করে আসছিল যে ইরান এবং লেবানন—এই দুই ফ্রন্টকে তারা গুঁড়িয়ে দেবে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন। দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর অগ্রযাত্রা এখন অনেকটাই মন্থর হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে আলোচনার মাধ্যমে ইরান যদি কোনো ছাড় পায়, তবে তা নেতানিয়াহু সরকারের জন্য বড় ধরনের কৌশলগত পরাজয় হিসেবে গণ্য হবে।
এদিকে, কূটনীতির আড়ালে হুমকির সুরও কমছে না। মঙ্গলবার সকালেই ইসরায়েলের নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ সরাসরি হিজবুল্লাহ প্রধান নাঈম কাসেমকে হত্যার হুমকি দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র না করা পর্যন্ত লেবাননে কোনো স্থিতি আসবে না। কাটজ লেবানন সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করছেন যাতে তারা হিজবুল্লাহর লাগাম টানে। অন্যদিকে উত্তর ইসরায়েলের সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে, যারা হিজবুল্লাহর রকেট হামলার মুখে মাসের পর মাস বাস্তুচ্যুত হয়ে আছেন।
এই জটিল প্রেক্ষাপটে ইসলামাবাদ এখন এক অদ্ভুত অনিশ্চয়তার চাদরে ঢাকা। শহরের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে লকডাউন চলছে, যা কোনো বড় কূটনৈতিক ইভেন্টের আগে স্বাভাবিক। ইসলামাবাদকেন্দ্রিক পাবলিক পলিসি বিশ্লেষক নিলোফার আফ্রিদি কাজি জানিয়েছেন, পাকিস্তান সরকার দিন-রাত এক করে দিচ্ছে দুই পক্ষকে মুখোমুখি বসাতে। তার মতে, আজ রাত বা আগামীকাল সকালের মধ্যে কোনো একটি ইতিবাচক খবর আসার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন যে, শুধু ইরানের বার্তাকে ‘রহস্যময়’ বলাটা ভুল হবে। ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াও সমানভাবে বিভ্রান্তিকর।
কাজি মনে করেন, এই পুরো প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ইসরায়েলি প্রভাব। ওয়াশিংটন যখন ইরানের সাথে কথা বলতে চায়, তখন ইসরায়েলের লবি এবং তাদের নিরাপত্তা উদ্বেগ মার্কিন প্রশাসনকে দ্বিধায় ফেলে দেয়। অন্যদিকে পাকিস্তান সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়েছে যে, আলোচনার টেবিলে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করতে হলে তেহরানের ওপর থেকে অন্তত আংশিক অবরোধ তুলে নিতে হবে। অবরোধ বহাল রেখে তেহরানকে টেবিলে ধরে রাখা কার্যত অসম্ভব বলে মনে করছে ইসলামাবাদ।
ইসলামাবাদ থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক কামাল হায়দার জানিয়েছেন, গত কয়েকদিন ধরেই শহরের রেড জোনকে দুর্গ বানিয়ে ফেলা হয়েছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা এমন পর্যায়ে নেওয়া হয়েছে যাতে কোনো ধরনের নাশকতা আলোচনার পরিবেশ নষ্ট করতে না পারে। তবে প্রশ্ন রয়েই যাচ্ছে—আলোচনা কি আদৌ শুরু হবে? তেহরান এবং ওয়াশিংটন থেকে আসা পাল্টাপাল্টি কঠোর বক্তব্য এই সম্ভাবনাকে দিন দিন ক্ষীণ করে তুলছে। কূটনৈতিক মহলে গুঞ্জন রয়েছে, আগামী ২৪ ঘণ্টা হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ের মধ্যে বৈঠক না হলে তা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত হয়ে যেতে পারে।
ইসরায়েল এই মুহূর্তে লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে নারাজ। তারা চায় অধিকৃত এলাকাগুলোতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে। যেকোনো শান্তি চুক্তি তাদের এই দখলদারিত্বের পথে বাধা হতে পারে। ফলে ইসলামাবাদে যা-ই ঘটুক না কেন, তেল আবিব চাইবে এমন কোনো শর্ত জুড়ে দিতে যা ইরান বা হিজবুল্লাহর পক্ষে মেনে নেওয়া অসম্ভব হয়। এভাবে আলোচনার দায় অন্যের ওপর চাপিয়ে দিয়ে যুদ্ধের পথ প্রশস্ত রাখাই এখন নেতানিয়াহুর প্রধান কৌশল বলে মনে করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে ইসলামাবাদ এখন এক স্নায়ুযুদ্ধের ময়দান। একদিকে শান্তির জন্য পাকিস্তানের প্রাণান্ত চেষ্টা, অন্যদিকে সেই শান্তিকে নস্যাৎ করার জন্য মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিগুলোর তৎপরতা। যদি এই আলোচনা ব্যর্থ হয়, তবে কেবল ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক নয়, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্য এক নতুন ও ভয়াবহ সংঘাতের মুখে পড়বে। বিশ্ব তাকিয়ে আছে ইসলামাবাদের দিকে—সেখানে কি করমর্দন হবে নাকি ফিরে আসবে যুদ্ধের বিভীষিকা? উত্তর পেতে হয়তো আমাদের আরও কিছু প্রহর অপেক্ষা করতে হবে।

