যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্যের শ্রেভপোর্ট শহর এখন এক স্তব্ধ জনপদ। রোববার ভোরের আলো ফোটার আগেই সেখানে ঘটে গেছে এক অবর্ণনীয় ট্র্যাজেডি। নিজের সাত সন্তানসহ মোট আট শিশুকে একে একে গুলি করে হত্যা করেছেন ৩১ বছর বয়সী এক বাবা। পারিবারিক কলহ থেকে শুরু হওয়া এই উন্মাদনা শেষ পর্যন্ত রূপ নিয়েছে এক পৈশাচিক গণহত্যায়। ২০২৪ সালের জানুয়ারির পর এটিই যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে প্রাণঘাতী বন্দুক হামলার ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
ঘাতক বাবার নাম শামার এলকিন্স। পুলিশি তথ্যমতে, রোববার সকালে এলকিন্স তার তাণ্ডব শুরু করেন নিজের ঘর থেকে। প্রথমে তিনি তার স্ত্রীকে লক্ষ্য করে গুলি চালান। গুরুতর আহত অবস্থায় স্ত্রী যখন বাঁচার জন্য লড়ছেন, এলকিন্স তখন ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েন। এরপর তিনি আলাদা তিনটি বাড়িতে হানা দিয়ে একে একে আটটি শিশুকে গুলি করেন। নিহতদের মধ্যে সাতজন এলকিন্সের নিজের সন্তান এবং একজন তাদের নিকটাত্মীয়।
শ্রেভপোর্ট পুলিশ বিভাগ নিশ্চিত করেছে যে, নিহত শিশুদের মধ্যে পাঁচজন কন্যা এবং তিনজন পুত্র সন্তান। তাদের বয়স মাত্র ৩ থেকে ১১ বছরের মধ্যে। সিএনএন-এর তথ্য অনুযায়ী, নিহত শিশুরা হলো— জায়লা এলকিন্স (৩), শায়লা এলকিন্স (৫), কায়লা পিউ (৬), লায়লা পিউ (৭), মারকেডন পিউ (১০), সারিয়া স্নো (১১), খেডারিওন স্নো (৬) এবং ব্রেলন স্নো (৫)। ছোট্ট এই শিশুদের নিথর দেহ উদ্ধারের পর পুরো শহর জুড়ে নেমে এসেছে শোকের আবহ।
এই নারকীয় হামলা থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে গেছে ১৩ বছর বয়সী এক কিশোর। ঘাতক যখন বাড়িতে ঢুকে গুলি চালাচ্ছিল, তখন প্রাণ বাঁচাতে সে ছাদ থেকে লাফ দেয়। এতে তার শরীরের বেশ কিছু হাড় ভেঙে গেলেও চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, সে বর্তমানে শঙ্কামুক্ত। তবে শিশুদের পাশাপাশি দুজন নারীও এই হামলার শিকার হয়েছেন। এলকিন্সের স্ত্রীর পাশাপাশি অন্য এক নারী আত্মীয়ও বর্তমানে হাসপাতালে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রয়েছেন।
কর্পোরাল ক্রিস বোর্ডেলোন জানান, এই নৃশংস ঘটনার খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশ ঘাতককে গ্রেপ্তারে অভিযান চালায়। এক পর্যায়ে পুলিশের সাথে এলকিন্সের গোলাগুলি হয়। পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হন শামার এলকিন্স। তাকে বর্তমানে কড়া পুলিশি পাহারায় হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তবে কেন তিনি নিজের সন্তানদের ওপর এমন নির্দয়ভাবে ঝাঁপিয়ে পড়লেন, তার সঠিক কারণ এখনো অস্পষ্ট।
তদন্তে উঠে এসেছে এলকিন্সের বিতর্কিত অতীত। ২০১৯ সালেও তিনি একবার গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। সে সময় এক ব্যক্তির সাথে বিরোধের জেরে একটি স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে সেই ব্যক্তির গাড়িতে পাঁচটি গুলি করেছিলেন তিনি। তৎকালীন পুলিশ রেকর্ডে তাকে একজন বিপজ্জনক ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও বড় কোনো সাজা তিনি ভোগ করেননি।
সামরিক বাহিনীর রেকর্ড অনুযায়ী, শামার এলকিন্স লুইজিয়ানা আর্মি ন্যাশনাল গার্ডে প্রায় সাত বছর কাজ করেছেন। ২০২০ সালের আগস্ট মাসে তিনি বাহিনী থেকে বিদায় নেন। যদিও চাকুরিকালীন তাকে কখনো বিদেশের কোনো যুদ্ধে বা বিশেষ কোনো মিশনে মোতায়েন করা হয়নি। তার সাবেক সহকর্মীরা এই ঘটনায় স্তম্ভিত। তাদের ভাষ্যমতে, এলকিন্সকে কখনো এমন সহিংস মেজাজে দেখা যায়নি।
লুইজিয়ানার এই হত্যাকাণ্ড যুক্তরাষ্ট্রে বন্দুক নিয়ন্ত্রণ আইন নিয়ে আবারও নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, মানসিক অস্থিরতা বা উগ্র মেজাজের মানুষের হাতে যখন মারণাস্ত্র পৌঁছায়, তখন এর পরিণতি এমনই ভয়াবহ হয়। শ্রেভপোর্টের রাস্তাঘাটে এখন কেবল পুলিশের সাইরেনের শব্দ আর স্বজন হারানোদের কান্নার রোল। এই ছোট শিশুদের নিষ্পাপ মুখগুলো এখন কেবলই ফ্রেমবন্দি ছবি হয়ে রয়ে গেল।
রোববারের এই ঘটনার পর এলাকাবাসীরা নিহতদের স্মরণে মোমবাতি প্রজ্জ্বলন করছেন। প্রতিটি বাড়ির লনে এখন শোকের স্তব্ধতা। পুলিশ জানিয়েছে, শামার এলকিন্সের শারীরিক অবস্থার উন্নতি হলেই তাকে আদালতে তোলা হবে। তার বিরুদ্ধে আটটি প্রথম স্তরের হত্যা মামলা এবং একাধিক খুনের চেষ্টার মামলা দায়ের করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এমন অনেক বন্দুক হামলার ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু নিজ বাবার হাতে সাত সন্তানের এই নিষ্ঠুর মৃত্যু দেশটিকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে। সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, পারিবারিক সহিংসতা এবং বন্দুকের সহজলভ্যতা যখন মিলে যায়, তখন সাধারণ ঘরগুলোও কসাইখানায় পরিণত হয়। লুইজিয়ানার এই রক্তপাত সেই রূঢ় বাস্তবতারই এক জ্বলন্ত প্রমাণ।
তদন্তকারী কর্মকর্তারা এখন খতিয়ে দেখছেন এই হামলার নেপথ্যে কোনো নির্দিষ্ট প্ররোচনা ছিল কি না। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, স্ত্রীর সাথে দীর্ঘদিনের তিক্ততা থেকেই এলকিন্স এমন চরম সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তবে যে শিশুদের পৃথিবীতে আনার দায়িত্ব ছিল তার, তাদের জীবন প্রদীপ এভাবেই নিভিয়ে দেওয়া কোনো যুক্তিতেই ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
শ্রেভপোর্টের এই রোববারের সকালটি হয়তো সময়ের সাথে ক্যালেন্ডার থেকে হারিয়ে যাবে, কিন্তু যে আটটি প্রাণ ঝরে গেল, তাদের অভাব কোনোদিন পূরণ হবার নয়। লুইজিয়ানার এই শোকাতুর পরিবেশে এখন একটাই প্রশ্ন সবার মুখে— নিরপরাধ শিশুদের রক্তে আর কতকাল ভিজবে আমেরিকান মাটি? এই নৃশংসতার শেষ কোথায়?

