মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আবারও যুদ্ধের ঘনঘটা। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চলমান দুই সপ্তাহের অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির মেয়াদ ফুরিয়ে আসায় তেহরানের অলিগলিতে এখন কেবলই অনিশ্চয়তা আর চাপা আতঙ্ক। গত ৮ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া এই সামরিক বিরতি আগামী ২২ এপ্রিল শেষ হতে যাচ্ছে। সময় যত ঘনিয়ে আসছে, সাধারণ ইরানিদের মধ্যে উৎকণ্ঠা ততটাই বাড়ছে।
রোববার (১৯ এপ্রিল) তেহরান থেকে আল জাজিরার সংবাদদাতা তৌহিদ আসাদি জানিয়েছেন, শহরের বাসিন্দাদের মধ্যে এক ধরণের মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। একদিকে আছে দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক মন্দা থেকে মুক্তির আশা, অন্যদিকে আবারও আকাশ থেকে বৃষ্টির মতো বোমা পড়ার চিরচেনা ভয়। তেহরানের বাজারের ভিড় কিংবা চায়ের দোকানের আড্ডায় এখন একটাই আলোচনা—আগামী বুধবারের পর কী হবে?
আসাদি তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন যে, সাধারণ ইরানিদের মনে ক্ষীণ হলেও একটি আশার আলো ছিল। তারা ভেবেছিলেন, পাকিস্তান ও ওমানের মধ্যস্থতায় চলা এই আলোচনার মাধ্যমে হয়তো যুক্তরাষ্ট্র চিরস্থায়ী কোনো চুক্তিতে আসবে। একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তি মানেই ছিল মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন। গত কয়েক বছরে ওষুধের সংকট আর আকাশচুম্বী মুদ্রাস্ফীতির কারণে ইরানিদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে।
তবে তেহরানের এই আশাবাদ এখন বিষাদে রূপ নিতে শুরু করেছে। বিশেষ করে হোর্মুজ প্রণালী পুনরায় বন্ধ করে দেওয়া এবং মার্কিন ড্রোন প্রতিহতের ঘটনার পর পরিস্থিতি আবারও জটিল হয়ে উঠেছে। ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে সাধারণ মানুষ এখন কেবলই হতাশা আর অনিশ্চয়তা দেখছেন। তৌহিদ আসাদির ভাষায়, “ইরানিরা কেবল যুদ্ধের ছায়া দেখেই আতঙ্কিত নন, তারা ভয় পাচ্ছেন অভাবনীয় কোনো হামলার।”
তেহরানবাসীর এই আতঙ্কের পেছনে যৌক্তিক কারণও রয়েছে। এর আগে যখনই দুপক্ষের মধ্যে আলোচনার টেবিল প্রস্তুত হয়েছে, তখনই দেশটিতে ভয়াবহ বিমান হামলা চালানো হয়েছে। গত মার্চ মাসে তেহরান ও ইসফাহানের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে দুই দফায় যে নজিরবিহীন আক্রমণ হয়েছিল, তা সাধারণ মানুষের মনে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। এবারও যুদ্ধবিরতির মাঝে নতুন করে হামলার আশঙ্কা তাদের তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।
তৌহিদ আসাদি আরও জানান, এই আতঙ্কের সমান্তরালে সাধারণ ইরানিদের মধ্যে প্রতিরোধের এক অদ্ভুত জেদও কাজ করছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই একদল মানুষকে দেখা গেছে যারা রাতদিন রাজপথে থেকে সরকারের পক্ষে অবস্থান জানান দিচ্ছেন। তারা মনে করেন, পশ্চিমাদের চাপের কাছে মাথা নত করার চেয়ে লড়াই করে টিকে থাকাই শ্রেয়। তবে এই সংখ্যাটি সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের তুলনায় কতটা সংহত, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এবারের যুদ্ধবিরতি টেকানো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতোমধ্যেই হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, হোর্মুজ প্রণালী সম্পূর্ণ উন্মুক্ত না করলে এবং ইরান তাদের পারমাণবিক লক্ষ্য থেকে সরে না এলে সামরিক পদক্ষেপ আবারও শুরু হবে। অন্যদিকে তেহরানের পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত তারা পিছু হটবে না।
তেহরানের রাস্তাগুলোতে এখন এক ধরণের থমথমে নীরবতা। ২২ এপ্রিলের শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে কয়েক কোটি মানুষের ভাগ্য। শান্তি না কি ধ্বংসযজ্ঞ—এই অমীমাংসিত প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে পুরো বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে তেহরান ও ওয়াশিংটনের দিকে। সাধারণ মানুষের প্রার্থনা একটাই, যেন ভোরের আকাশে বোমার বদলে শান্তির বার্তা নিয়ে সূর্যের উদয় হয়।

