মার্কিন রাজনীতির উত্তপ্ত ময়দানে এবার নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে ইরান-ইসরায়েল সংঘাত। সাবেক মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট কমালা হ্যারিস এক বিস্ফোরক মন্তব্যে দাবি করেছেন, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর কারণেই ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছেন।
শনিবার মিশিগানের ডেট্রয়েটে এক নির্বাচনী তহবিল সংগ্রহ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে কমালা হ্যারিস বর্তমান প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতির কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন এক যুদ্ধে প্রবেশ করেছেন যা আদতে আমেরিকার সাধারণ মানুষ চায় না।
কমালা হ্যারিসের মতে, এই যুদ্ধ কেবল অপ্রয়োজনীয় নয়, বরং এটি মার্কিন সেনাদের জীবনকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে এই সংঘাতের পথে টেনে নিয়ে গেছেন।
ডেট্রয়েটের সেই অনুষ্ঠানে কমালা হ্যারিস আরও বলেন, “আমাদের অত্যন্ত স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন—ট্রাম্প আজ যে যুদ্ধের ময়দানে দাঁড়িয়ে আছেন, সেখানে তাকে কার্যত টেনে এনেছেন নেতানিয়াহু। এটি আমেরিকার জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী।”
তার এই অভিযোগ এমন এক সময়ে এল যখন মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতি এবং সংঘাত নিরসনে আন্তর্জাতিক মহলে নানামুখী দৌড়ঝাঁপ চলছে। বিশেষ করে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র মতো সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে চলছে তুমুল বিতর্ক।
সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট কমালা হ্যারিস কেবল যুদ্ধের সমালোচনা করেই ক্ষান্ত হননি। তিনি ট্রাম্প প্রশাসনকে মার্কিন ইতিহাসের অন্যতম “অদক্ষ ও দুর্নীতিগ্রস্ত” সরকার হিসেবেও আখ্যায়িত করেন। তার মতে, মিত্রদের রক্ষা করার পরিবর্তে ট্রাম্প প্রশাসন আন্তর্জাতিক নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা করছে না।
কমালা হ্যারিসের এই সরাসরি আক্রমণের বিপরীতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন করেননি। তবে প্রথা অনুযায়ী তিনি তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ কড়া ভাষায় জবাব দিয়েছেন।
ট্রাম্প তার পোস্টে সরাসরি কমালা হ্যারিসের নাম উল্লেখ না করলেও ইসরায়েলের প্রতি তার অটুট সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি ইসরায়েলকে আমেরিকার ইতিহাসের সবচেয়ে “নির্ভরযোগ্য এবং সাহসী” মিত্র হিসেবে বর্ণনা করেন।
সাবেক এই রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট লেখেন, “মানুষ ইসরায়েলকে পছন্দ করুক আর না-ই করুক, তারা জানে কীভাবে জয়ী হতে হয়। এই কঠিন সময়ে যখন অনেকেই পিছু হটেছে, ইসরায়েল তখন অকুতোভয় থেকেছে।”
ট্রাম্পের মতে, ইসরায়েলিরা বিচক্ষণ এবং তারা জানে কীভাবে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা করতে হয়। তিনি দাবি করেন, যুদ্ধের ময়দানে ইসরায়েল সর্বস্ব দিয়ে লড়াই করার ক্ষমতা রাখে এবং শেষ পর্যন্ত বিজয় ছিনিয়ে আনার সক্ষমতা তাদের রয়েছে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি প্রতিনিয়ত পাল্টাচ্ছে। সম্প্রতি লেবাননের সাথে দশ দিনের একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হলেও ইরান সীমান্তের উত্তেজনা এখনও প্রশমিত হয়নি। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন থেকেও ইরানি বন্দরগুলো দীর্ঘমেয়াদে অবরোধ করার হুমকি দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কমালা হ্যারিসের এই মন্তব্য আসন্ন নির্বাচনের আগে ডেমোক্র্যাটদের রণকৌশলেরই অংশ। তারা বোঝাতে চাইছেন যে, ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি মূলত বিদেশি নেতাদের দ্বারা প্রভাবিত এবং এটি মার্কিন তরুণ সেনাদের জীবনকে বিপন্ন করছে।
অন্যদিকে নেতানিয়াহু অতীতে একাধিকবার এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, ইসরায়েল কাউকে যুদ্ধে টেনে আনে না, বরং তারা কেবল নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করছে। ট্রাম্পও সবসময় দাবি করে এসেছেন যে, তার সিদ্ধান্ত কেবল ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির ওপর ভিত্তি করেই নেওয়া হয়।
এই বাকযুদ্ধ কেবল ওয়াশিংটনেই সীমাবদ্ধ নেই, এর প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক কূটনীতিতেও। পাকিস্তান ও কাতারের মতো দেশগুলো মধ্যস্থতার চেষ্টা চালালেও পরমাণু ইস্যু এবং যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতিপূরণ নিয়ে বড় ধরনের মতভেদ এখনও রয়ে গেছে।
কমালা হ্যারিস তার বক্তব্যে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সংহতির ওপর জোর দিয়ে বলেন, বর্তমান অস্থিতিশীলতা থেকে উত্তরণের জন্য একটি দায়িত্বশীল নেতৃত্বের বিকল্প নেই। তিনি মনে করেন, ট্রাম্পের নীতি আমেরিকাকে বিশ্বমঞ্চে বন্ধুহীন করে তুলছে।
তবে ট্রাম্পের সমর্থকরা এই অভিযোগকে “রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা” হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, ট্রাম্পের দৃঢ় অবস্থানের কারণেই ইসরায়েল আজ মধ্যপ্রাচ্যে টিকে আছে এবং ইরানের প্রভাব রুখে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
সংঘাত ও কূটনীতির এই টানাপোড়েনের মাঝে সাধারণ মানুষের উৎকণ্ঠা বাড়ছে। ইরানের সাথে সরাসরি যুদ্ধ শুরু হলে তার অর্থনৈতিক ও মানবিক প্রভাব কতটুকু সুদূরপ্রসারী হবে, তা নিয়েই এখন চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
শেষ পর্যন্ত নেতানিয়াহু ও ট্রাম্পের এই রসায়ন মধ্যপ্রাচ্যকে শান্তির পথে নিয়ে যাবে নাকি আরও বড় কোনো ধ্বংসযজ্ঞের দিকে ঠেলে দেবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। কমালা হ্যারিসের মতো সমালোচকরা অবশ্য অন্ধকারের আশঙ্কাই বেশি দেখছেন।

