ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে দীর্ঘ সময় পর্দার আড়ালেই ছিলেন তিনি। অবশেষে সব জল্পনার অবসান ঘটিয়ে জনসমক্ষে না এলেও নিজের টেলিগ্রাম চ্যানেলের মাধ্যমে বিশ্ববাসীকে এক শক্তিশালী বার্তা দিলেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি। শনিবার ইরান সেনাবাহিনী প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর এক বিশেষ বার্তায় তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, মার্কিন বাহিনীকে পরাজিত করতে তেহরানের নৌবাহিনী এখন পুরোপুরি প্রস্তুত এবং শত্রুদের জন্য অপেক্ষা করছে পরাজয়ের এক ‘তিক্ত স্বাদ’।
মোজতবা খামেনি তার বিবৃতিতে ইরানি সশস্ত্র বাহিনীর সাহসিকতার প্রশংসা করে বলেন, “আমাদের সাহসী নৌবাহিনী শত্রুদের ওপর নতুন এবং চরম অপমানজনক পরাজয় চাপিয়ে দেওয়ার জন্য মুহূর্ত গুনছে।” চলমান উত্তেজনার মাঝে তার এই মন্তব্য ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের জন্য এক সরাসরি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে যখন দুই দেশের নৌবাহিনী মুখোমুখি অবস্থানে, তখন সর্বোচ্চ নেতার এমন কঠোর অবস্থান যুদ্ধের ঝুঁকিকে আরও উসকে দিয়েছে।
সাম্প্রতিক যুদ্ধের সময় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা এবং স্বার্থ সংশ্লিষ্ট এলাকায় পরিচালিত ড্রোন হামলার ভূয়সী প্রশংসা করেন মোজতবা খামেনি। তিনি দাবি করেন, এই যুদ্ধের মাধ্যমে ইরানের সামরিক বাহিনী বিশ্ববাসীর সামনে যুক্তরাষ্ট্র ও ‘জায়নবাদী’ শক্তির দুর্বলতা ও অপমানের বিষয়টি উন্মোচন করে দিয়েছে। তার ভাষায়, “ইরানি ড্রোন অপরাধীদের ওপর বজ্রপাতের মতো আঘাত হেনেছে,” যা প্রমাণ করে তেহরানের প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত শ্রেষ্ঠত্ব।
খামেনির এই বার্তার কয়েক ঘণ্টা আগেই ইরানের যৌথ সামরিক কমান্ড হরমুজ প্রণালীতে পুনরায় কঠোর অবরোধ আরোপের ঘোষণা দেয়। সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ এখন সম্পূর্ণভাবে সশস্ত্র বাহিনীর হাতে এবং আগের মতোই কড়া পাহারা নিশ্চিত করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের নেপথ্যে রয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনড় অবস্থান। ট্রাম্প সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, যতক্ষণ পর্যন্ত তেহরান ওয়াশিংটনের সব শর্ত মেনে স্থায়ী চুক্তিতে সই না করছে, ততক্ষণ ইরানি বন্দরগুলোতে মার্কিন অবরোধ ‘পূর্ণ শক্তিতে’ বহাল থাকবে।
হোয়াইট হাউসের এই হুঁশিয়ারির পরপরই তেহরান তার পাল্টা চাল চেলেছে। ইরানের সামরিক কমান্ড স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, যতদিন তাদের বন্দরগুলো অবরুদ্ধ থাকবে, ততদিন হরমুজ প্রণালী দিয়ে কোনো বিদেশি জাহাজকে পার হতে দেওয়া হবে না। মূলত ট্রাম্পের ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগের কৌশলের বিপরীতে ইরান এখন তাদের ভৌগোলিক ও কৌশলগত অবস্থানকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে।
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মোজতবা খামেনির এই বার্তা কেবল একটি আনুষ্ঠানিক বক্তব্য নয়, বরং এটি ইরানি জনগণের এবং সামরিক বাহিনীর মনোবল চাঙ্গা করার একটি সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ। যুদ্ধের শুরুতে ইরানের অনেক ক্ষয়ক্ষতি হলেও, খামেনি বোঝাতে চেয়েছেন যে তারা দমে যাননি। বরং নতুন কোনো সংঘাত শুরু হলে ইরান আরও ভয়াবহ রূপ নিয়ে আবির্ভূত হবে।
বর্তমানে পারস্য উপসাগরে এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে। একদিকে মার্কিন যুদ্ধবিমান ও রণতরীর মহড়া, অন্যদিকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ইউনিটের সর্বোচ্চ সতর্কতা— সব মিলিয়ে পরিস্থিতি যে কোনো সময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় শান্তি আলোচনার যে ক্ষীণ আশা তৈরি হয়েছিল, খামেনির এই রণহুঙ্কার এবং ট্রাম্পের আল্টিমেটাম সেই আশার প্রদীপকে অনেকটাই ম্লান করে দিয়েছে।
বিশ্বের জ্বালানি তেলের এক বিশাল অংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয় বলে আন্তর্জাতিক বাজারও এখন গভীর উদ্বেগে রয়েছে। তেলের দাম এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা এখন সরাসরি এই সংঘাতের ফলাফলের ওপর নির্ভর করছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ২২ এপ্রিলের সেই বিতর্কিত সময়সীমার আগে দুই দেশ কি কোনো নমনীয় অবস্থানে আসবে, নাকি মোজতবা খামেনির দেওয়া সেই ‘তিক্ত স্বাদ’ আস্বাদন করতে হবে পুরো বিশ্বকে? সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে, আর সেই সাথে বাড়ছে এক প্রলয়ঙ্কারী যুদ্ধের পদধ্বনি।

