যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর হুঁশিয়ারির রেশ কাটতে না কাটতেই এবার সরাসরি যুদ্ধের ডাক দিলেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তেহরানের সঙ্গে চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টা যদি ব্যর্থ হয়, তবে পুনরায় সামরিক অভিযান শুরু করতে ইসরায়েলি বাহিনী পুরোপুরি প্রস্তুত।
বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ‘টাইমস অব ইসরায়েল’-এর এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটন যখন ইরানের সঙ্গে দ্বিতীয় দফার আলোচনার প্রস্তুতি নিচ্ছে, ঠিক তখনই তেল আবিব তাদের সামরিক প্রস্তুতি চূড়ান্ত করার কথা জানিয়ে ইরানকে চাপে রাখার কৌশল নিয়েছে।
এক বিশেষ ভিডিও বার্তায় নেতানিয়াহু বলেন, “ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র আমাদের নিয়মিত তথ্য দিচ্ছে এবং এই সংকটে দুই দেশের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অভিন্ন। আমরা চাই ইরান থেকে সমস্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরিয়ে নেওয়া হোক এবং তাদের অভ্যন্তরে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার সক্ষমতা চিরতরে নির্মূল করা হোক।” তিনি আরও যোগ করেন, হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা ইসরায়েলের অন্যতম প্রধান শর্ত।
উল্লেখ্য, বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের এক-পঞ্চমাংশ এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের পর থেকে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী এই রুটটি অবরুদ্ধ করে রেখেছে, যা বর্তমানে মার্কিন নৌ-অবরোধের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
এদিকে, পাকিস্তানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দ্বিতীয় দফার একটি বৈঠকের জোরালো সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট জানিয়েছেন, পরবর্তী আলোচনা পাকিস্তানের রাজধানীতে হওয়ার ‘প্রবল সম্ভাবনা’ রয়েছে এবং ট্রাম্প প্রশাসন একটি চুক্তির বিষয়ে আশাবাদী।
বুধবার পাকিস্তানের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল তেহরানে পৌঁছেছে। ইরানের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের মধ্যস্থতায় কিছু ক্ষেত্রে মতভেদ কমলেও পরমাণু ইস্যু এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ে এখনও মৌলিক বিরোধ রয়ে গেছে। বিশেষ করে কত সময়ের জন্য এবং কোন শর্তে ইউরেনিয়াম মজুত রাখা যাবে, তা নিয়ে দুই পক্ষই নিজ নিজ অবস্থানে অনড়।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানিয়েছেন, তারা ইরানকে একটি ‘বড় ধরনের চুক্তির’ (Big Deal) প্রস্তাব দিচ্ছেন। এই চুক্তির আওতায় ছয় সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি এবং ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে কয়েক দশকের পুরনো বিরোধ মেটানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক মন্তব্য এই আলোচনার টেবিলে ছায়া ফেলছে।
নেতানিয়াহু কড়া স্বরে বলেন, “এই পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে, তা বলার সময় এখনও আসেনি। তবে আমরা কোনো ঝুঁকি নিতে রাজি নই। যদি কূটনৈতিক সমাধান না আসে, তবে পুনরায় যুদ্ধ শুরু করার জন্য আমরা যেকোনো মুহূর্তের জন্য প্রস্তুত আছি।”
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, একদিকে আলোচনার প্রস্তাব এবং অন্যদিকে যুদ্ধের সরাসরি হুমকি—এই ‘ক্যারেট অ্যান্ড স্টিক’ নীতি প্রয়োগ করে ইরানকে সমঝোতায় বাধ্য করতে চাইছে মিত্র দেশগুলো। তবে তেহরান যদি এই চাপের মুখে মাথা নত না করে, তবে মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী ও বিধ্বংসী সংঘাতের শুরু হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আপাতত সবার নজর ইসলামাবাদের দিকে, যেখানে নির্ধারিত হতে পারে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ শান্তি অথবা আরও একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের রূপরেখা। তবে নেতানিয়াহুর এই ‘যুদ্ধ প্রস্তুতি’র ঘোষণা সেই শান্তিকামী প্রচেষ্টাকে কতটা চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে, তা নিয়ে চলছে আন্তর্জাতিক মহলে চুলচেরা বিশ্লেষণ।

