মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে উত্তেজনা যখন ফুটন্ত কড়াইয়ের মতো টগবগ করছে, ঠিক তখনই ইরানের অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে নতুন করে চড়াও হলো যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের কাছ থেকে অপরিশোধিত তেল কেনা অব্যাহত রাখলে সংশ্লিষ্ট দেশ এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কঠোর ‘দ্বিতীয় পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞা’ (Secondary Sanctions) আরোপের চূড়ান্ত হুঁশিয়ারি দিয়েছে ওয়াশিংটন।
গতকাল বুধবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে নবনিযুক্ত মার্কিন ট্রেজারিমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এই কড়া বার্তা পৌঁছে দেন। তার এই ঘোষণা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করার নীতি আরও কঠোর হতে যাচ্ছে।
বেসেন্ট সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “আমরা বিভিন্ন দেশের সরকারকে ইতিমধ্যে আমাদের অবস্থান পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছি। কোনো দেশ যদি ইরানের কাছ থেকে তেল কেনে, কিংবা কোনো দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ইরানি মুদ্রার লেনদেন বা উপস্থিতি পাওয়া যায়, তবে তাদের বিরুদ্ধে আমরা কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেব।”
মার্কিন প্রশাসনের এই হুমকির মূল লক্ষ্য যে বেইজিং, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। পরিসংখ্যান বলছে, ইরানের মোট উৎপাদিত তেলের প্রায় ৮০ শতাংশই যায় চীনে। ফলে চীনকে এই বাণিজ্য থেকে সরিয়ে আনতে না পারলে তেহরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব নয় বলে মনে করছে হোয়াইট হাউস।
ট্রেজারিমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বেইজিংকে লক্ষ্য করে বলেন, “আমরা চীনের দুটি বড় ব্যাংককে ইতিমধ্যে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়েছি। সেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে, যদি আপনাদের কোনো অ্যাকাউন্টে ইরানি রিয়াল পাওয়া যায় কিংবা ইরানের অর্থপ্রবাহে আপনাদের ব্যাংকের সম্পৃক্ততার প্রমাণ মেলে, তবে সেই ব্যাংকগুলোকেও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার খড়গ সইতে হবে।”
গত ১২ এপ্রিল থেকে মার্কিন প্রতিরক্ষা বাহিনী কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি এবং ইরানের প্রধান বন্দরগুলোতে এক প্রকার অবরোধ জারি করে রেখেছে। এই অবরোধের ফলে ইরানের তেল রপ্তানি ব্যাহত হচ্ছে। বেসেন্ট আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, এই সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ সম্মিলিতভাবে চীনকে ইরানি তেল কেনা থেকে বিরত থাকতে বাধ্য করবে।
কেবল হুমকি দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি ওয়াশিংটন। গতকাল বুধবার ইরানের তেল পরিবহন অবকাঠামোর ওপর নতুন করে একগুচ্ছ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে তারা। এই তালিকায় দুই ডজনেরও বেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যারা আন্তর্জাতিক বাজারে ইরানি তেল চোরাচালান বা পরিবহনে সহায়তা করে আসছিল।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই ‘সর্বাত্মক চাপ’ প্রয়োগের কৌশল বিশ্ববাজারে তেলের দামে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে চীনের মতো বড় শক্তি এই হুমকিকে কীভাবে নেয়, তার ওপর নির্ভর করছে বৈশ্বিক অর্থনীতির গতিপথ। বেইজিং যদি ওয়াশিংটনের এই নির্দেশ উপেক্ষা করে, তবে দুই পরাশক্তির মধ্যে বাণিজ্যিক যুদ্ধ নতুন মাত্রা পাবে।
টাইমস অব ইসরায়েলের তথ্য অনুযায়ী, এই নিষেধাজ্ঞাগুলো কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ নয়, বরং মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এখন নিবিড়ভাবে নজর রাখছে কোন কোন জাহাজ বা আর্থিক সংস্থা তেহরানকে সহযোগিতা করছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে দুর্বল করতে তেল বাণিজ্য বন্ধ করাই এখন ট্রাম্প প্রশাসনের প্রধান অস্ত্র।
ইরানের পক্ষ থেকে অবশ্য এই পদক্ষেপকে ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। তেহরানের দাবি, মার্কিন এই অবরোধ আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী এবং এর ফলে অঞ্চলের সাধারণ মানুষের কষ্ট আরও বাড়বে। তবে ওয়াশিংটন তাদের অবস্থানে অনড়, যার ফলে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে সংঘাতের কালো মেঘ আরও ঘনীভূত হচ্ছে।

