দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা বৈরিতা আর রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর আজ এক ঐতিহাসিক ক্ষণের সাক্ষী হতে যাচ্ছে বিশ্ব। দীর্ঘ ৩৪ বছরের স্থবিরতা কাটিয়ে প্রথমবারের মতো আজ বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) সরাসরি বৈঠকে বসছেন ইসরাইল ও লেবাননের শীর্ষ নেতারা। মধ্যপ্রাচ্যের চরম অস্থিরতার মাঝে এই আলোচনাকে একটি বড় ধরনের কূটনৈতিক মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই এই চাঞ্চল্যকর খবরটি সামনে এনেছেন। বুধবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ এক বার্তায় তিনি এই বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। ট্রাম্পের এই আকস্মিক ঘোষণা বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
নিজের বার্তায় ট্রাম্প লিখেছেন, তিনি ইসরাইল ও লেবাননের মধ্যকার দীর্ঘদিনের উত্তেজনা নিরসনে ব্যক্তিগতভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি উল্লেখ করেন, প্রায় ৩৪ বছর ধরে দুই দেশের নেতৃত্বের মধ্যে কোনো সরাসরি সংলাপ হয়নি। এই অচলায়তন ভেঙে আগামীকাল অর্থাৎ বৃহস্পতিবার তারা আলোচনার টেবিলে বসবেন, যা তার ভাষায় একটি ‘ইতিবাচক অগ্রগতি’।
গত কয়েক মাস ধরে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। গত ২ মার্চ থেকে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ উত্তর ইসরাইলে নতুন করে হামলা শুরু করলে সংঘাত চরম আকার ধারণ করে। এর জবাবে লেবাননের অভ্যন্তরে ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে ইসরাইলি বাহিনী।
ইসরাইলের অব্যাহত বিমান ও স্থল হামলায় লেবাননের মানবিক পরিস্থিতি বর্তমানে অত্যন্ত সংকটাপন্ন। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গত দেড় মাসে দখলদার বাহিনীর হামলায় দেশটিতে দুই হাজারেরও বেশি সাধারণ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে অসংখ্য বসতবাড়ি ও স্থাপনা।
যুদ্ধের ভয়াবহতায় লেবাননের প্রায় ১০ লাখের বেশি মানুষ তাদের ভিটেমাটি ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো থেকে বাস্তুচ্যুত এই বিশাল জনগোষ্ঠী এখন মানবেতর জীবনযাপন করছে। এমন পরিস্থিতিতে এই বৈঠক তাদের মনে কিছুটা হলেও স্বস্তির আভাস দিচ্ছে।
ইসরাইলি সামরিক বাহিনী ইতিমধ্যে দক্ষিণ লেবাননে স্থল অভিযান চালিয়ে বেশ কিছু এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। ইসরাইলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, তারা নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেখানে একটি ‘বাফার জোন’ বা নিরাপদ অঞ্চল তৈরি করতে চাইছে। তবে লেবানন এই পদক্ষেপকে তাদের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন হিসেবে দেখে আসছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ৩৪ বছর পর এই বৈঠক হওয়া মানেই যুদ্ধ থেমে যাওয়া নয়। তবে দীর্ঘ সময় পর দুই পক্ষ কথা বলতে রাজি হওয়াটা একটি বড় কূটনৈতিক জয়। বিশেষ করে হোয়াইট হাউসের সরাসরি তত্ত্বাবধানে এই আলোচনা শুরু হওয়াতে এর গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে গেছে।
এদিকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার উত্তপ্ত সম্পর্কের মাঝে এই বৈঠকটি ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। গুঞ্জন রয়েছে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী সম্ভাব্য আলোচনাটি পাকিস্তানের ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত হতে পারে। সেই পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে লেবানন-ইসরাইল বৈঠকটি পুরো অঞ্চলের অস্থিরতা কমাতে সহায়ক হতে পারে।
লেবাননের সাধারণ মানুষের মধ্যে এই বৈঠক নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। বৈরুতের ধ্বংসস্তূপের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষেরা যেমন যুদ্ধের অবসান চান, তেমনি সার্বভৌমত্ব নিয়ে কোনো আপস করতেও নারাজ। অন্যদিকে, ইসরাইলের অভ্যন্তরেও হিজবুল্লাহর রকেট হামলা থেকে স্থায়ী মুক্তির দাবিতে চাপ বাড়ছে নেতানিয়াহু সরকারের ওপর।
যুগান্তকারী এই আলোচনার মূল এজেন্ডা কী হবে, তা এখনো বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি। তবে ধারণা করা হচ্ছে, দক্ষিণ লেবাননের সীমান্ত নির্ধারণ এবং একটি কার্যকর যুদ্ধবিরতিই হবে বৈঠকের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। মার্কিন প্রশাসন চাইছে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সেখানে একটি স্থিতিশীল পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে।
লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন এবং ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই ঐতিহাসিক সংলাপে কতটা নমনীয় হবেন, তা নিয়ে জল্পনা চলছে। এর আগে নব্বইয়ের দশকে শেষবার দুই দেশের মধ্যে এ ধরনের উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের চেষ্টা হয়েছিল। তারপর থেকে কেবল বন্দুকের ভাষাই শুনেছে দুই দেশ।
মধ্যপ্রাচ্যে তেলের বাজার এবং বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য এই বৈঠকটি অত্যন্ত জরুরি। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ফলে ওই অঞ্চলে জ্বালানি সংকট তীব্র হয়েছে এবং বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একটি সফল সমঝোতা কেবল রক্তপাতই বন্ধ করবে না, বরং আঞ্চলিক অর্থনীতিতেও প্রাণসঞ্চার করবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই বৈঠকটিকে তার পররাষ্ট্রনীতির একটি বড় সাফল্য হিসেবে প্রচার করছেন। তার দীর্ঘদিনের দাবি ছিল, তিনি মধ্যপ্রাচ্যের ‘অন্তহীন যুদ্ধ’ শেষ করতে সক্ষম। আজ বৃহস্পতিবারের বৈঠকটি সেই দাবির সপক্ষে একটি বড় পরীক্ষা হতে যাচ্ছে।
পুরো বিশ্বের নজর এখন আজ বিকেলের এই বৈঠকের দিকে। লেবাননের সীমান্ত থেকে শুরু করে বৈরুতের অলিগলি—সবখানেই এখন একটাই প্রশ্ন, ৩৪ বছরের এই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান কি শেষ পর্যন্ত শান্তির বার্তা নিয়ে আসবে? নাকি এটি কেবল আরেকটি কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা হয়েই রয়ে যাবে?
যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের দীর্ঘশ্বাস আর রাজনীতির মারপ্যাঁচের মাঝে এই আলোচনা এক নতুন সূচনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। যদি সত্যি একটি কার্যকর সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়, তবে তা হবে বর্তমান দশকের অন্যতম সেরা কূটনৈতিক অর্জন। তবে মাঠের বাস্তবতা আর টেবিলের আলোচনার দূরত্ব ঘুচানোই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এই বৈঠকের প্রতি মুহূর্তের খবরের জন্য তীক্ষ্ণ নজর রাখছে। আল জাজিরাসহ বিভিন্ন প্রভাবশালী মিডিয়া জানিয়েছে, এই আলোচনায় কোনো চূড়ান্ত চুক্তি না হলেও নিয়মিত সংলাপের একটি পথ উন্মুক্ত হতে পারে। আর সেটিই হতে পারে মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তির প্রথম পদক্ষেপ।

