ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের প্রবল সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপের মুখেও নতিস্বীকার না করার দৃপ্ত ঘোষণা দিলেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। বুধবার তেহরানে জরুরি পরিষেবা কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে জানিয়েছেন, ইরানকে ভয় দেখিয়ে বা অবরোধের মুখে ফেলে ‘আত্মসমর্পণে’ বাধ্য করার যেকোনো বিদেশি প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হতে বাধ্য।
প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান এমন এক সময়ে এই মন্তব্য করলেন, যার কয়েক ঘণ্টা আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে, ইরান যুদ্ধ ‘শেষের খুবই কাছাকাছি’ এবং চলতি সপ্তাহেই ফের শান্তি আলোচনা শুরু হতে পারে। ট্রাম্পের সেই ‘বিজয়োল্লাসের’ সুরের বিপরীতে পেজেশকিয়ানের এই বক্তব্য তেহরানের অনমনীয় অবস্থানেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ইরানের সাধারণ জনগণ বিদেশি শক্তির কোনো জবরদস্তিমূলক শর্ত বা অপমানজনক প্রস্তাব কখনোই মেনে নেবে না।
বৈঠকে পেজেশকিয়ান বলেন, তেহরান কখনোই এই অঞ্চলে ‘যুদ্ধ বা অস্থিতিশীলতা’ চায়নি। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইরান সবসময়ই একটি সম্মানজনক ও ‘গঠনমূলক আলোচনা’র পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তবে সেই আলোচনা হতে হবে সমমর্যাদার ভিত্তিতে, কোনো পক্ষের চাপিয়ে দেওয়া শর্তে নয়। তার এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, ওয়াশিংটন যদি মনে করে কেবল সামরিক অভিযান চালিয়ে তেহরানকে টেবিলের একতরফা চুক্তিতে সই করাবে, তবে তা হবে ভুল হিসেবনিকেশ।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, পেজেশকিয়ানের এই হুশিয়ারি মূলত অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক দুই ফ্রন্টেই একটি বার্তা। একদিকে তিনি দেশের জনগণকে আশ্বস্ত করছেন যে সরকার চাপের মুখে ভেঙে পড়ছে না, অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনকে বুঝিয়ে দিচ্ছেন যে ইসলামাবাদের দ্বিতীয় দফার বৈঠকের আগে তেহরান তার সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো আপস করবে না।
যদিও ডোনাল্ড ট্রাম্প চলতি সপ্তাহে পুনরায় আলোচনা শুরুর বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন, তবে তেহরান এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে এর কোনো দিনক্ষণ নিশ্চিত করেনি। বরং সাম্প্রতিক দিনগুলোতে পারস্য উপসাগরে মার্কিন নৌবাহিনীর তেলবাহী ট্যাংকার ফিরিয়ে দেওয়া এবং ড্রোন বিধ্বস্ত হওয়ার মতো ঘটনাগুলো আলোচনার টেবিলকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সূত্র বলছে, পেজেশকিয়ান প্রশাসনের ওপর একদিকে যেমন দেশের অর্থনীতি সচল করার চাপ রয়েছে, অন্যদিকে রয়েছে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর প্রত্যাশা। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে তিনি যেভাবে ‘গঠনমূলক আলোচনা’র কথা বলছেন, তা এক ধরণের কৌশলগত অবস্থান হতে পারে। তিনি বিশ্বকে বোঝাতে চাইছেন যে, ইরান আলোচনার দরজা বন্ধ করেনি, কিন্তু আত্মসমর্পণের চাবিও কাউকে দেবে না।
বিবিসি ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, পেজেশকিয়ানের এই কঠোর সুরের পেছনে রয়েছে ইরানের দীর্ঘদিনের প্রতিরোধ সংস্কৃতি। তিনি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে যে অভিযান চালাচ্ছে, তা ইরানকে দুর্বল করার চেয়ে বরং তাদের সংকল্পকে আরও দৃঢ় করেছে।
এখন দেখার বিষয়, ইসলামাবাদের আসন্ন দ্বিতীয় দফার বৈঠকে পেজেশকিয়ানের এই ‘অনমনীয় ভাবমূর্তি’ বনাম ট্রাম্পের ‘সর্বোচ্চ চাপ’—এই দুই মেরুর লড়াই শেষ পর্যন্ত কোনো মধ্যম পন্থায় পৌঁছাতে পারে কি না। বিশ্ব রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—কামানের গর্জন থামিয়ে শান্তি কি ফিরবে, নাকি পেজেশকিয়ানের এই হুশিয়ারি নতুন কোনো দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের পূর্বাবাস? মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ আপাতত সেই অনিশ্চয়তার মেঘেই ঢাকা।

