মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত জলসীমায় ইরানের জ্বালানি বাণিজ্যের ওপর শৃঙ্খল আরও শক্ত করল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সোমবার থেকে শুরু হওয়া এক বিশেষ অভিযানে ইরানের বন্দর অভিমুখে যাত্রা করা অন্তত আটটি বিশাল তেলবাহী ট্যাংকারকে মাঝপথেই আটকে দিয়েছে মার্কিন নৌবাহিনী। কোনো ধরনের সরাসরি সংঘাত বা বলপ্রয়োগ ছাড়াই কেবল বেতার বার্তার মাধ্যমে জাহাজগুলোকে ফিরে যেতে বাধ্য করা হয়েছে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন নৌবাহিনীর এই পদক্ষেপ ছিল অত্যন্ত সুশৃঙ্খল এবং সুনির্দিষ্ট। প্রতিটি ক্ষেত্রেই মার্কিন যুদ্ধজাহাজ থেকে রেডিওর মাধ্যমে ইরানি বা ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ওই ট্যাংকারগুলোর ক্রুদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তাদের সাফ জানিয়ে দেওয়া হয় যে, বর্তমান নিরাপত্তা বলয় অতিক্রম করে সামনে এগোনোর অনুমতি তাদের নেই। মার্কিন নির্দেশ পাওয়ার পর প্রতিটি জাহাজই কোনো প্রকার প্রতিরোধ না দেখিয়ে গতিপথ পরিবর্তন করে পেছনের দিকে ফিরে যায়।
প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমটি আরও জানিয়েছে, এই অভিযানে মার্কিন নৌসেনাদের কোনো জাহাজে সরাসরি উঠতে হয়নি কিংবা কোনো তল্লাশি চালানোরও প্রয়োজন পড়েনি। স্রেফ সামরিক হুঁশিয়ারিতেই কাজ হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরানের ওপর ঘোষিত সাম্প্রতিক মার্কিন নৌ-অবরোধের অংশ হিসেবেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে তেহরানের তেল রপ্তানি বা আমদানির পথ কার্যত রুদ্ধ করে দিতে চাইছে ওয়াশিংটন।
আল-জাজিরার তথ্যমতে, পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন নৌবাহিনীর উপস্থিতি এখন যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি সংলগ্ন এলাকাগুলোতে ড্রোন ও নজরদারি জাহাজের মাধ্যমে প্রতিটি নৌযানের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। এই আটটি ট্যাংকার ফিরিয়ে দেওয়ার ঘটনাটি তেহরানের জন্য বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কূটনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে যে, যুক্তরাষ্ট্র এই পদক্ষেপের মাধ্যমে তেহরানকে একটি স্পষ্ট বার্তা দিতে চেয়েছে—তা হলো, আলোচনার টেবিলে বসার আগে বা চলাকালীন সময়ে তাদের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে দেওয়ার সক্ষমতা ওয়াশিংটনের রয়েছে। বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন যখন ইরানকে একটি কঠোর চুক্তিতে বাধ্য করতে চাইছে, তখন এই নৌ-অবরোধ সেই চাপের কৌশলেরই একটি অংশ।
ইরানের পক্ষ থেকে এই ঘটনার বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো কড়া প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এভাবে একের পর এক তেলবাহী ট্যাংকার ফিরিয়ে দেওয়া হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে, ইরানের অভ্যন্তরেও এর বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করবে।
পারস্য উপসাগরের এই টানাপড়েন কেবল দুটি দেশের শক্তির লড়াই নয়, বরং এটি বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ধমনীর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লড়াই। আটটি ট্যাংকার ফিরে যাওয়া কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি নির্দেশ করছে যে আগামী দিনগুলোতে সমুদ্রপথে তেহরানের জন্য দিনগুলো আরও কঠিন হতে যাচ্ছে। ওয়াশিংটনের এই অনমনীয় অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিকে কোন দিকে নিয়ে যায়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

