দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংঘাত আর অনিশ্চয়তার পর অবশেষে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে কি শান্তির আভাস দেখা দিচ্ছে? মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যে অন্তত তেমন ইঙ্গিতই মিলছে। ফক্স নিউজকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের মধ্যে চলমান বিধ্বংসী যুদ্ধ এখন ‘শেষের খুবই কাছাকাছি’ এসে পৌঁছেছে। তবে যুদ্ধ শেষের আশার বাণীর পাশাপাশি কঠোর হুশিয়ারিও দিয়ে রেখেছেন হোয়াইট হাউসের এই অধিপতি।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে ইরানের সামনে বড় কোনো বিকল্প খোলা নেই। তিনি সাফ জানিয়েছেন, মার্কিন বাহিনী ইরানে তাদের অভিযান পুরোপুরি শেষ না করলেও তেহরান এখন খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে। ট্রাম্পের ভাষায়, মার্কিন সামরিক শক্তি ইরানকে এমন এক বিপর্যয়ের মুখে ফেলেছে যে, আজ যদি যুক্তরাষ্ট্র সব গুটিয়ে চলেও যায়, তবে দেশটির পুনর্গঠনে অন্তত দুই দশক সময় লেগে যাবে। এই সামরিক চাপের মুখেই তেহরান এখন মরিয়া হয়ে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে চাইছে বলে তিনি মনে করেন।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানের পরমাণু প্রকল্প এবং দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দেশটিতে যৌথ অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। টানা ৪০ দিনের সেই প্রচণ্ড লড়াইয়ের পর গত ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে দুই সপ্তাহের একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় পক্ষগুলো। যদিও এই সময়টুকুতে জনমনে স্বস্তি ফেরার কথা ছিল, কিন্তু কূটনৈতিক লড়াইয়ের জটিলতা শান্তি প্রক্রিয়াকে বারবার বাধাগ্রস্ত করছে।
এই অস্থায়ী যুদ্ধবিরতিকে একটি স্থায়ী শান্তিতে রূপ দিতে গত ১১ এপ্রিল পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে মুখোমুখি হয়েছিলেন দুই দেশের শীর্ষ প্রতিনিধিরা। রুদ্ধদ্বার কক্ষে টানা ২২ ঘণ্টা ধরে চলা সেই আলোচনায় বিশ্বের নজর থাকলেও ফলাফল ছিল হতাশাজনক। কোনো ধরনের সমঝোতা চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়েছিল সেই বৈঠক। কূটনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছিল, তবে কি আবারো কামানের গর্জন শোনা যাবে পারস্য উপসাগরের তীরে?
কিন্তু মঙ্গলবার ট্রাম্পের দেওয়া নতুন বক্তব্য সেই শঙ্কা কিছুটা হলেও প্রশমিত করেছে। তিনি জানিয়েছেন, ইসলামাবাদে খুব শীঘ্রই দ্বিতীয় দফায় বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিরা। ট্রাম্পের এই আত্মবিশ্বাস ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, পর্দার আড়ালে হয়তো বড় কোনো সমঝোতার খসড়া তৈরি হচ্ছে। তিনি বিশ্বাস করেন, তেহরান এখন আলোচনার টেবিলে নমনীয় হতে বাধ্য হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই কৌশলের মূলে রয়েছে ‘ম্যাক্সিমাম প্রেশার’ বা সর্বোচ্চ চাপের নীতি। একদিকে সামরিক আঘাতের ভয় দেখানো, অন্যদিকে অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির দোহাই দিয়ে প্রতিপক্ষকে চুক্তিতে আনা। ট্রাম্পের বক্তব্যেও সেই প্রতিফলন স্পষ্ট। তিনি একদিকে বলছেন যুদ্ধ শেষের পথে, অন্যদিকে মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে মার্কিন সেনারা এখনো তাদের কাজ ‘শেষ করেনি’। এই দ্বিমুখী অবস্থান মূলত তেহরানের ওপর মানসিক চাপ বজায় রাখারই অংশ।
ইরানের জন্য গত কয়েক সপ্তাহ ছিল ভয়াবহ চ্যালেঞ্জের। মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলায় দেশটির সামরিক ও কৌশলগত অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সাধারণ মানুষের জীবনে নেমে এসেছে চরম বিপর্যয়। এই অবস্থায় ইসলামাবাদে দ্বিতীয় দফার বৈঠকটি তেহরানের জন্য অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা কি তাদের পরমাণু কর্মসূচির দাবি থেকে সরে আসবে, নাকি সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন তুলে আবারো সংঘাতের পথ বেছে নেবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
এদিকে ইসরায়েল শুরু থেকেই ইরানের পরমাণু সক্ষমতা ধ্বংসের ব্যাপারে আপসহীন। মার্কিন অভিযানের সাথে যুক্ত থাকলেও তেল আবিব সবসময় চেয়ে এসেছে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর পূর্ণ বিনাশ। ট্রাম্পের ‘যুদ্ধ শেষের’ ঘোষণা ইসরায়েল কতটুকু ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করবে, তা নিয়েও রয়েছে রাজনৈতিক বিতর্ক। কারণ, একটি দুর্বল চুক্তি ভবিষ্যতে আবারও ইরানকে শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ করে দিতে পারে বলে মনে করে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা।
ইসলামাবাদ বৈঠকের ব্যর্থতা সত্ত্বেও দ্বিতীয় দফায় আলোচনায় ফেরার ঘোষণাটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মোড়। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুদ্ধের এই ৪০ দিনে ইরান যে পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে, তা দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও অস্থিরতা তৈরি করেছে। ফলে ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, তেহরান যদি সত্যিই একটি ‘তীব্র চুক্তির’ প্রত্যাশা করে থাকে, তবে ইসলামাবাদের দ্বিতীয় বৈঠকটি হতে পারে এই শতকের অন্যতম ঐতিহাসিক মুহূর্ত।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা এই পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছেন। মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা মানেই বিশ্ববাজারে তেলের মূল্যের উর্ধ্বগতি এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তার চরম ঝুঁকি। পাকিস্তান এই শান্তি আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে যে ভূমিকা রাখছে, তা দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতেও নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ইসলামাবাদে গত সপ্তাহের সেই দীর্ঘ ২২ ঘণ্টার বৈঠক কোনো ফল না আনলেও তা আলোচনার একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বক্তব্যে একটি প্রচ্ছন্ন দম্ভ থাকলেও বাস্তবতাকে অস্বীকার করার উপায় নেই। মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে শক্তির ভারসাম্য এখন অনেকটাই ওয়াশিংটনের দিকে ঝুঁকে আছে। তবে ইতিহাস বলে, ইরানিরা সহজে মাথানত করার মতো জাতি নয়। তাই ‘যুদ্ধ শেষের কাছাকাছি’—ট্রাম্পের এই দাবি কতটা বাস্তবসম্মত নাকি তা কেবলই একটি রাজনৈতিক কৌশল, তার প্রমাণ পাওয়া যাবে ইসলামাবাদে পরবর্তী কয়েক দিনের আলোচনায়।
আপাতত বিশ্ববাসী তাকিয়ে আছে সেই দ্বিতীয় দফার বৈঠকের দিকে। যদি সত্যিই কোনো চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, তবে তা হবে দীর্ঘদিনের উত্তেজনার এক বড় প্রশমন। আর যদি আলোচনা আবারো ভেস্তে যায়, তবে যুদ্ধের দাবানল যে কেবল ইরান নয়, গোটা অঞ্চলকে গ্রাস করবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে এখন সেই চাবিকাঠি—তিনি কি যুদ্ধের পূর্ণ সমাপ্তি টানবেন, নাকি ‘কাজ শেষ করার’ নামে নতুন কোনো অধ্যায়ের সূচনা করবেন?
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই ছায়াযুদ্ধ আর সরাসরি সংঘাতের অবসান ঘটাতে এখন সময়ের অপেক্ষা। ইসলামাবাদের সেই টেবিলই ঠিক করে দেবে আগামীর মানচিত্র। ট্রাম্পের কথা সত্যি হলে হয়তো আর কদিন পরেই রণক্ষেত্র থেকে ফিরে আসবে সেনারা। কিন্তু সেই শান্তির মূল্য ইরানকে কতটা দিতে হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। সংঘাতের এই শেষলগ্নে পৌঁছে সারা বিশ্ব প্রার্থনা করছে একটি দীর্ঘস্থায়ী ও স্থিতিশীল সমাধানের জন্য।

