ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে নিজেদের অপূরণীয় ক্ষয়ক্ষতির খতিয়ান প্রকাশ করেছে ইরান। তেহরানের দেওয়া তথ্যমতে, সাম্প্রতিক হামলায় দেশটির প্রায় ২৭০ বিলিয়ন ডলারের অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৩৩ লাখ কোটি টাকার সমতুল্য। মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) ঘনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ এক সরকারি কর্মকর্তার বরাতে এই ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে।
ইরান সরকারের মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহজেরানি এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, এটি কেবল প্রাথমিক পর্যবেক্ষণের ফলাফল। যুদ্ধের তাণ্ডবে ধ্বংস হওয়া সরকারি-বেসরকারি ভবন, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এবং যুদ্ধের কারণে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর লোকসান মিলিয়ে এই বিশাল অংকের হিসাব করা হয়েছে। তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ নিরূপণের কাজ এখনো চলছে, তাই এই সংখ্যাটি আরও বাড়তে পারে।
মোহজেরানি জানান, গত শনিবার পাকিস্তানের ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের সঙ্গে যে দীর্ঘ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল, সেখানে এই বিশাল ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তোলা হয়। ইরান দাবি করেছে, এই অন্যায্য হামলায় তাদের অর্থনীতির যে মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া হয়েছে, তার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। মূলত শান্তি আলোচনার টেবিলে নিজেদের অবস্থানের সপক্ষে এই তথ্যগুলোকে বড় প্রমাণ হিসেবে পেশ করছে তেহরান।
বিশ্লেষকদের মতে, ৩৩ লাখ কোটি টাকার এই ক্ষতি একটি উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদী পঙ্গুত্বের নামান্তর। শিল্পাঞ্চলগুলোতে উৎপাদন স্থবির হয়ে পড়ায় এবং সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর এর চরম প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। অনেক ক্ষেত্রে তেলের রিফাইনারি ও বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালানোয় দেশটির জ্বালানি খাতও বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে।
এদিকে ইসলামাবাদে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে সরাসরি আলোচনা চললেও শেষ পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি সই হয়নি। দুই পক্ষই নিজ নিজ অবস্থানে অনড় থাকায় আলোচনার টেবিল থেকে কোনো সমাধান বেরিয়ে আসেনি। বর্তমানে যে সাময়িক যুদ্ধবিরতি চলছে, তার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর দুই দেশের মধ্যে আবারও পূর্ণমাত্রার সংঘাত শুরু হওয়ার প্রবল আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বিবিসির প্রতিবেদন বলছে, ইরানের এই বিশাল আর্থিক ক্ষতির তথ্য প্রকাশের পেছনে একটি বড় উদ্দেশ্য হলো আন্তর্জাতিক জনমত নিজেদের পক্ষে আনা। তেহরান প্রমাণ করতে চাইছে যে, প্রতিরক্ষা ও সার্বভৌমত্বের লড়াইয়ে তারা কতটা চরম মূল্য দিচ্ছে। তবে ওয়াশিংটন বা ইসরায়েল এই ক্ষয়ক্ষতির দায় স্বীকার করে কোনো ধরনের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো ইতিবাচক ইঙ্গিত দেয়নি।
হরমোজ প্রণালিতে মার্কিন নৌ-অবরোধ এবং আলোচনার ব্যর্থতা এমনিতেই ইরানের অর্থনীতিকে শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় ফেলে দিয়েছে। তার ওপর এই নতুন হিসাব দেশটির ভবিষ্যৎ পুনর্গঠন প্রক্রিয়াকে আরও অনিশ্চিত করে তুলল। যুদ্ধবিরতির এই নাজুক সময়ে ইরান যখন ধ্বংসস্তূপের হিসাব কষছে, তখন বিশ্ববাসী উৎকণ্ঠায় প্রহর গুনছে—পরবর্তী সূর্যোদয় কি নতুন কোনো সংঘাতের বার্তা নিয়ে আসবে, নাকি শান্তির পথে কোনো মিরাকল ঘটবে?

