মধ্যপ্রাচ্যের বারুদঠাসা পরিস্থিতির মধ্যে নতুন এক কূটনৈতিক সমীকরণ সামনে আনলেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ইরানের হাতে থাকা স্পর্শকাতর ইউরেনিয়াম মজুত রাশিয়ায় স্থানান্তরের একটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়েছে মস্কো। সোমবার ক্রেমলিনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
পেসকভ জানান, ওয়াশিংটন এবং এই অঞ্চলের সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে নিবিড় আলোচনার পরেই পুতিন এই প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন। মূলত তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে চলমান সংঘাতের পারদ নামাতেই রাশিয়ার এই মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা। এর আগেও অনুরূপ প্রস্তাব দিয়েছিল মস্কো, তবে বর্তমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এবারের উদ্যোগটিকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গত রবিবার ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে পুতিনের দীর্ঘ ফোনালাপ হয়েছে। ইসলামাবাদে মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিদের মধ্যে গোপন বৈঠকের বিস্তারিত তথ্য রুশ প্রেসিডেন্টকে অবহিত করেন পেজেশকিয়ান। জবাবে পুতিন স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার যেকোনো রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় রাশিয়া পূর্ণ সহযোগিতা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
বর্তমান হিসাব অনুযায়ী, ইরানের ভাণ্ডারে প্রায় ৪০০ কেজি ইউরেনিয়াম রয়েছে, যার বিশুদ্ধতার মাত্রা ৬০ শতাংশ। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) বারবার সতর্ক করেছে যে, এই বিশুদ্ধতা ৯০ শতাংশে উন্নীত হলেই ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরির সক্ষমতা অর্জন করবে। যদিও তেহরান শুরু থেকেই দাবি করে আসছে যে তাদের এই কর্মসূচি কেবল শান্তিপূর্ণ গবেষণার কাজে সীমাবদ্ধ।
ইরানের এই পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে গত দুই দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চলা স্নায়ুযুদ্ধ গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে সরাসরি সংঘাতে রূপ নিয়েছে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ত্রিমুখী যুদ্ধের ফলে পুরো বিশ্ব অর্থনীতি ও রাজনীতি এখন টালমাটাল। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে গত মার্চে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে ১৫ দফার একটি শান্তি প্রস্তাব পাঠান।
ট্রাম্পের সেই শান্তি প্রস্তাবের অন্যতম প্রধান শর্ত ছিল—ইরানের হাতে থাকা ইউরেনিয়াম হয় সম্পূর্ণ ধ্বংস করতে হবে, না হয় দেশ থেকে সরিয়ে ফেলতে হবে। আমেরিকার এই কড়া অবস্থানের প্রেক্ষিতেই পুতিন এখন ইউরেনিয়াম রাশিয়ায় সরিয়ে নেয়ার প্রস্তাব দিলেন, যা ইরান ও পশ্চিমাদের মধ্যে একটি ‘মধ্যপন্থা’ হিসেবে কাজ করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউরেনিয়াম রাশিয়ায় চলে গেলে ইরানের পরমাণু বোমা তৈরির তাৎক্ষণিক সক্ষমতা স্তিমিত হবে, যা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের উদ্বেগ প্রশমিত করতে পারে। অন্যদিকে, তেহরানও সরাসরি পশ্চিমাদের হাতে তাদের সম্পদ তুলে না দিয়ে রাশিয়ার মতো দীর্ঘদিনের মিত্রের কাছে তা গচ্ছিত রাখার ব্যাপারে কিছুটা নমনীয় হতে পারে।
তবে এই প্রস্তাব শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখবে কি না, তা নির্ভর করছে ওয়াশিংটনের সবুজ সংকেত এবং তেহরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর। দিমিত্রি পেসকভের ভাষায়, মস্কো কেবল পথ দেখাচ্ছে, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে বিবদমান পক্ষগুলোকেই।
বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে তেহরানের প্রতিক্রিয়ার দিকে। যদি এই স্থানান্তর প্রক্রিয়া সফল হয়, তবে তা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। দীর্ঘ দুই দশকের পারমাণবিক অচলাবস্থা কাটানোর জন্য এটি কি শেষ সুযোগ? সেই উত্তর হয়তো মিলবে আগামী কয়েক সপ্তাহের কূটনৈতিক তৎপরতায়।
গভীর অনিশ্চয়তার মাঝেও পুতিনের এই প্রস্তাবকে একটি লাইফলাইন হিসেবে দেখছেন অনেক শান্তিকামী মানুষ। যুদ্ধের দামামা ছাপিয়ে এখন কূটনৈতিক টেবিলের লড়াই কতটা সফল হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

