মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে বারুদের গন্ধ এখনো পুরোপুরি মেলায়নি, তবে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া কূটনীতি ফের মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। ১৪ দিনের সংক্ষিপ্ত যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই এক টেবিলে বসার জোরালো আগ্রহ দেখিয়েছে ওয়াশিংটন ও তেহরান। পর্দার আড়ালে চলা এই দৌড়ঝাঁপ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ভয়াবহতা এড়াতে দুই পক্ষই এখন সংলাপকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে চায়।
প্রাসঙ্গিক সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে, মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তাদের মধ্যে ইতিমধ্য়েই প্রাথমিক যোগযোগ শুরু হয়েছে। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে আবারও পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদকেই বেছে নেওয়া হচ্ছে। যদিও গত ১১ এপ্রিলের বৈঠকটি কোনো সুনির্দিষ্ট সমাধান ছাড়াই শেষ হয়েছিল, তবুও সেই ব্যর্থতা কূটনৈতিক চ্যানেলগুলো বন্ধ করতে পারেনি। বরং অচলাবস্থা ভাঙতে নতুন উদ্যমে কাজ করছে দুই দেশের প্রতিনিধি দল।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের তথ্যের ভিত্তিতে এএফপি জানিয়েছে, গত দফার আলোচনা সফল না হলেও কূটনৈতিক পথ খোলা রাখা এখন উভয় পক্ষের জন্যই অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। ওয়াশিংটন চাইছে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ও পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে একটি কাঠামোর মধ্যে আনতে। অন্যদিকে, তেহরান চাইছে যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা সামাল দিতে কিছুটা সময় এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শ্বাস নেওয়ার সুযোগ।
ইসলামাবাদের কূটনৈতিক পাড়ায় এখন সাজ সাজ রব। পাকিস্তানি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা নিয়মিতভাবে উভয় দেশের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলছেন। মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের ভূমিকা এখন অত্যন্ত সংবেদনশীল। ইসলামাবাদ চাইছে আলোচনার মাধ্যমে এমন একটি মধ্যপন্থা বের করতে, যা মধ্যপ্রাচ্যে চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘাতের স্থায়ী অবসান ঘটাবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই শত্রুতার ইতিহাস দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বিস্তৃত। ইরানের বিতর্কিত পারমাণবিক প্রকল্প এবং দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে ওয়াশিংটনের অস্বস্তি দীর্ঘদিনের। এই সংকটের স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে চলতি বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে টানা ২১ দিন সংলাপ চলেছিল। তবে ২৭ ফেব্রুয়ারি সেই সংলাপ কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি ছাড়াই ভেঙে যায়।
সংলাপ ব্যর্থ হওয়ার পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ ছিল অত্যন্ত নাটকীয় এবং বিধ্বংসী। ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানে বড় ধরনের হামলা চালায়, যার কোডনেম ছিল ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’। ঠিক একই সময়ে ইসরায়েলি বাহিনীও ‘অপারেশন রোয়ারিং লায়ন’ নামে তাদের সামরিক অভিযান শুরু করে। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে পাল্টে যায় পুরো অঞ্চলের মানচিত্র।
যুদ্ধের প্রথম দিনটি ছিল ইরানের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতির দিন। দীর্ঘ ৩৭ বছর ক্ষমতায় থাকা ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়তুল্লাহ খামেনি নিহত হন সেই হামলায়। শুধু শীর্ষ নেতাই নন, ইরানের বর্তমান সরকারের বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী এবং জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই সমন্বিত অভিযানে প্রাণ হারান। এই আকস্মিক নেতৃত্বশূন্যতা ইরানকে এক নজিরবিহীন সংকটের মুখে ঠেলে দেয়।
যুদ্ধের ৩৯ দিনের মাথায়, গত ৭ এপ্রিল পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত করার লক্ষ্যে উভয় পক্ষই যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। এই যুদ্ধবিরতির মূল উদ্দেশ্য ছিল মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা এবং আলোচনার টেবিলে ফেরার পরিবেশ তৈরি করা। সেই ধারাবাহিকতায় ১১ এপ্রিল ইসলামাবাদে দুই দেশের প্রতিনিধিরা ২১ ঘণ্টা ধরে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। কিন্তু দীর্ঘ আলোচনার পরও কোনো সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়নি।
এখন প্রশ্ন উঠছে, আগের বৈঠক ব্যর্থ হওয়ার পরও কেন আবারও ইসলামাবাদকেই বেছে নেওয়া হচ্ছে? বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পাকিস্তানের ভৌগোলিক অবস্থান এবং উভয় পক্ষের সাথে সুসম্পর্ক দেশটিকে একটি নিরাপদ ক্ষেত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এছাড়া ইরানের নতুন নেতৃত্ব এখন নিজেদের গুছিয়ে নিতে চাইছে, আর ওয়াশিংটন চাইছে সরাসরি সংঘাত কমিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করতে।
ইরানের সাধারণ মানুষ এখন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে। রাজধানী তেহরানের রাস্তাঘাটে এখনো যুদ্ধের ক্ষত দৃশ্যমান। ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বিধ্বস্ত ভবনগুলো মনে করিয়ে দিচ্ছে সংঘাতের ভয়াবহতা। সাধারণ নাগরিকদের একটাই চাওয়া—যেকোনো উপায়ে শান্তি ফিরে আসুক। আর সেই শান্তির চাবিকাঠি এখন ইসলামাবাদের আসন্ন দ্বিতীয় দফা বৈঠকের ওপর নির্ভর করছে।
হোয়াইট হাউসের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো বলছে, জো বাইডেন প্রশাসন এখন ঘরোয়া রাজনীতিতেও চাপের মুখে। নির্বাচনের আগে মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া তাদের জন্য ঝুঁকির কারণ হতে পারে। তাই সামরিক শক্তির চেয়ে এখন কূটনীতিতেই বেশি ভরসা রাখছে পেন্টাগন। অন্যদিকে, ইরানও বুঝতে পারছে যে শীর্ষ নেতৃত্বের অনুপস্থিতিতে মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের মোকাবিলা করা দীর্ঘমেয়াদে কঠিন হবে।
তবে এই সম্ভাব্য সংলাপের পথে অনেকগুলো বড় কাঁটা রয়েছে। ইসরায়েলের অবস্থান এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকার শুরু থেকেই ইরানের সাথে যেকোনো ধরনের আপস চুক্তির বিরোধিতা করে আসছে। তারা মনে করে, ইরানকে চাপে রাখার একমাত্র উপায় হলো সামরিক শক্তি। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কোনো সমঝোতা হলেও তাতে ইসরায়েল কতটা সায় দেবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়।
ইসলামাবাদে দ্বিতীয় দফার বৈঠকটি যদি সফল হয়, তবে তা হবে এ দশকের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক সাফল্য। কিন্তু যদি এবারের আলোচনাও ভেস্তে যায়, তবে ১৪ দিনের যুদ্ধবিরতি শেষে মধ্যপ্রাচ্য আবারও এক ভয়াবহ অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হতে পারে। পুরো বিশ্বের অর্থনীতি এবং জ্বালানি তেলের বাজারও এই আলোচনার ফলাফলের দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখছে।
কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবারের সংলাপে শুধু পারমাণবিক ইস্যুতে সীমাবদ্ধ থাকলেই চলবে না। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব এবং ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলোকেও টেবিলে আনতে হবে। একটি ভারসাম্যপূর্ণ চুক্তির মাধ্যমেই কেবল এই অঞ্চলের অস্থিরতা কমানো সম্ভব। অন্যথায়, অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি কেবল আরও বড় ধ্বংসযজ্ঞের পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবেই বিবেচিত হবে।
সব মিলিয়ে, আগামী কয়েক দিন আন্তর্জাতিক রাজনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামাবাদে কি সত্যিই শান্তির সাদা পায়রা উড়বে, নাকি আবারও যুদ্ধের দামামা বেজে উঠবে—সে উত্তর সময়ের গর্ভেই লুকিয়ে আছে। তবে এটা স্পষ্ট যে, বুলেট আর বোমার চেয়ে এখন আলোচনার টেবিলে বসা শব্দগুলোই বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।
গুগল নিউজ বা আল জাজিরার মতো আন্তর্জাতিক মাধ্যমগুলো এই সংবাদের ওপর নিবিড় পর্যবেক্ষণ রাখছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর এবং ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরবর্তী বিবৃতির ওপর নির্ভর করছে অনেক কিছু। ইসলামাবাদের ওই ২১ ঘণ্টার রুদ্ধদ্বার বৈঠক থেকে যা পাওয়া যায়নি, দ্বিতীয় দফার আলোচনায় তার চেয়ে বেশি কিছু অর্জিত হবে বলে আশাবাদী কূটনৈতিক মহল।
মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা রক্ষায় এই সংলাপের কোনো বিকল্প নেই। যুদ্ধের ময়দান থেকে আলোচনার টেবিলে ফিরে আসা দুই দেশের জন্যই এটি বড় চ্যালেঞ্জ। এখন দেখার বিষয়, ওয়াশিংটন ও তেহরান কি তাদের দীর্ঘদিনের বৈরিতা পেছনে ফেলে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারবে, নাকি ইসলামাবাদ আবারও এক ব্যর্থ আলোচনার সাক্ষী হয়ে থাকবে?
সংঘাতের এই জটিল আবর্তে সাধারণ মানুষের জীবনই সবচেয়ে বড় মূল্য দেয়। তাই বিশ্বনেতারাও এখন চাইছেন সংঘাতের অবসান। তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিশ্বাসের অভাব একটি বড় বাধা। সেই বিশ্বাসের ঘাটতি মিটিয়ে একটি সম্মানজনক চুক্তিতে পৌঁছানোই হবে ইসলামাবাদ বৈঠকের মূল সাফল্য।

