মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক অস্থির সময়ের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের মিত্রতা চুরমার করে তুরস্ককে নিজেদের পরবর্তী ‘প্রধান শত্রু’ হিসেবে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে পারে ইসরায়েল। আঙ্কারার শীর্ষ কূটনীতিকের এই বিস্ফোরক মন্তব্য এমন এক সময়ে এল, যখন পারমাণবিক ও নিরাপত্তা ইস্যুতে ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যকার আলোচনা এক কঠিন মোড় নিয়েছে। সোমবার তুর্কি সংবাদ সংস্থা আনাদোলুকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান এই আশঙ্কার কথা জানান।
ফিদান দাবি করেছেন, তেল আবিব বর্তমানে এমন একটি মনস্তাত্ত্বিক বলয়ের মধ্যে রয়েছে যেখানে শত্রু ছাড়া তাদের টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী ছায়াযুদ্ধ এবং সরাসরি সংঘাতের পর এখন তারা তুরস্কের দিকে নজর দিচ্ছে। ফিদানের মতে, কৌশলগত কারণেই ইসরায়েল এখন তুরস্ককে নতুন প্রতিপক্ষ হিসেবে চিত্রায়িত করার ছক কষছে। এই বক্তব্য তুরস্ক ও ইসরায়েলের মধ্যে বাড়তে থাকা কূটনৈতিক টানাপোড়েনকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেল।
আঙ্কারার এই উদ্বেগের সমান্তরালে গত শনিবার পাকিস্তানের ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার বহুল আলোচিত বৈঠকটি কোনো সুনির্দিষ্ট সমাধান ছাড়াই শেষ হয়েছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই আলোচনায় দুই পক্ষই নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকায় কোনো চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। তবে হাকান ফিদান মনে করেন, চুক্তির ব্যাপারে দুই পক্ষই ‘আন্তরিক’। ব্যর্থতার পরেও কূটনৈতিক আলোচনার পথ পুরোপুরি রুদ্ধ হয়ে যায়নি বলেই তিনি বিশ্বাস করেন।
এদিকে ইসলামাবাদের বৈঠক ব্যর্থ হওয়া সত্ত্বেও আশার আলো দেখছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তিনি সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিকে লক্ষ্য করে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। পেজেশকিয়ান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বার্তায় জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন যদি তাদের ‘স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাব’ এবং আধিপত্যকামী দৃষ্টিভঙ্গি ত্যাগ করে, তবেই সমঝোতা সম্ভব। তার মতে, ইরানের জনগণের জাতীয় অধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শনই হতে পারে যে কোনো চুক্তির মূল ভিত্তি।
ইরানি প্রেসিডেন্ট তার বার্তায় ইসলামাবাদের আলোচনায় অংশ নেওয়া প্রতিনিধি দলের প্রশংসা করেন। বিশেষ করে স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের কালিবাফকে তার ভূমিকার জন্য অভিনন্দন জানান তিনি। পেজেশকিয়ানের এই মন্তব্য ইঙ্গিত দেয় যে, তেহরান আলোচনার টেবিলে নমনীয় হতে রাজি, তবে তা আত্মসম্মান ও সার্বভৌমত্ব বিসর্জন দিয়ে নয়। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রকে তার চিরাচরিত চাপ প্রয়োগের নীতি থেকে সরে আসতে হবে।
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আশঙ্কা এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার এই অচলাবস্থা মধ্যপ্রাচ্যকে এক গভীর অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইসরায়েল যদি সত্যিই তুরস্ককে আনুষ্ঠানিকভাবে শত্রু হিসেবে ঘোষণা করে, তবে ন্যাটোর অভ্যন্তরীণ সমীকরণে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। তুরস্ক ন্যাটোর গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হওয়ায় ইসরায়েলের এমন পদক্ষেপ পশ্চিমা মিত্রদের জন্য এক কঠিন ধর্মসংকট তৈরি করতে পারে।
গাজা এবং লেবানন ইস্যুতে আঙ্কারার কঠোর অবস্থান ইতিমধ্যে তেল আবিবকে ক্ষুব্ধ করেছে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান একাধিকবার ইসরায়েলি সরকারকে ‘সন্ত্রাসবাদী রাষ্ট্র’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। হাকান ফিদানের সাম্প্রতিক বক্তব্য সেই তিক্ততারই বহিঃপ্রকাশ। তিনি মনে করেন, ইসরায়েল আঞ্চলিক আধিপত্য বজায় রাখতে ধারাবাহিকভাবে নতুন নতুন ফ্রন্ট খুলতে চায়, যাতে তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও নিরাপত্তা কৌশল প্রশ্নাতীত থাকে।
ইসলামাবাদে হওয়া আলোচনার বিস্তারিত এখনও জনসমক্ষে আসেনি, তবে সূত্রমতে, পরমাণু কর্মসূচির সীমাবদ্ধতা এবং ইরানের ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বড় ধরনের মতভেদ রয়েছে। ওয়াশিংটন চাইছে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকেও আলোচনার আওতায় আনতে, যা তেহরান শুরু থেকেই প্রত্যাখ্যান করে আসছে। এই দর কষাকষিতে দুই পক্ষই এখন ‘ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ’ বা অপেক্ষার নীতি গ্রহণ করেছে।
তুরস্কের পক্ষ থেকে ফিদান আরও বলেন, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি টেকসই চুক্তি অপরিহার্য। তবে ইসরায়েলের বর্তমান প্রশাসন এই ধরনের কোনো চুক্তির ঘোর বিরোধী। ইসরায়েলের আশঙ্কা, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার দূরত্ব কমে গেলে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের একক প্রভাব খর্ব হবে। এই কারণেই সম্ভবত তারা তুরস্কের মতো শক্তিশালী আঞ্চলিক শক্তিকে নিশানা করতে চাইছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের কৌশল এখন বহুমুখী। তারা একদিকে ইরানের ওপর চাপ বজায় রাখছে, অন্যদিকে তুরস্কের মতো উদীয়মান মুসলিম শক্তিগুলোর কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা করছে। হাকান ফিদান যে ‘শত্রু ছাড়া টিকতে না পারা’র তত্ত্বে কথা বলেছেন, তা মূলত ইসরায়েলের চিরস্থায়ী যুদ্ধংদেহী মনোভাবকেই নির্দেশ করে। এই পরিস্থিতি আঙ্কারা ও জেরুজালেমের মধ্যকার বাণিজ্যিক ও সামরিক সম্পর্ককে চিরতরে ছিন্ন করার পথে নিয়ে যেতে পারে।
ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এই আলোচনার প্রভাব বেশ জোরালো। প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান সংস্কারপন্থী ও রক্ষণশীলদের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে আন্তর্জাতিক মহলে নিজের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। তার ‘স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাব’ ত্যাগের আহ্বান মূলত পশ্চিমা বিশ্বের প্রতি একটি চ্যালেঞ্জ এবং একই সঙ্গে বন্ধুত্বের প্রস্তাবও বটে। তেহরান এখন দেখার অপেক্ষায় আছে যে, হোয়াইট হাউস তাদের এই আহ্বানে কতটা ইতিবাচক সাড়া দেয়।
সামগ্রিকভাবে, মধ্যপ্রাচ্যের এই নতুন সমীকরণ বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। একদিকে তুরস্ক ও ইসরায়েলের সম্ভাব্য সংঘাতের সম্ভাবনা, অন্যদিকে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র পরমাণু চুক্তির অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। এই দুই মেরুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে পুরো অঞ্চল এখন এক অস্থির সন্ধিক্ষণে। হাকান ফিদান এবং মাসুদ পেজেশকিয়ানের বক্তব্যগুলো কেবল সরকারি ভাষ্য নয়, বরং আগামী দিনের সম্ভাব্য রক্তক্ষয়ী বা কূটনৈতিক সংঘাতের আগাম সংকেত হিসেবেই দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
আগামী দিনগুলোতে ওয়াশিংটনের পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির পথে কতটুকু অগ্রগতি হবে। যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান শেষ পর্যন্ত কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে, তবে তা ইসরায়েলের তুরস্ক-কেন্দ্রিক কৌশলকে ব্যর্থ করে দিতে পারে। অন্যথায়, আঙ্কারা ও তেল আবিবের মধ্যে যদি সত্যিই আনুষ্ঠানিক শত্রুতা শুরু হয়, তবে তা সমগ্র ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধের নতুন দাবানল ছড়িয়ে দিতে পারে।
পরিশেষে, তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সতর্কবার্তা বিশ্ব সম্প্রদায়কে নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনো দেশই চিরস্থায়ী বন্ধু বা শত্রু নয়, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তুরস্ক ও ইসরায়েলের বৈরিতা যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, তা নিরসনে বড় কোনো কূটনৈতিক উদ্যোগ আপাতত দৃশ্যমান নয়। আনাদোলু এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এই পরিস্থিতির ওপর গভীর নজর রাখছে, কারণ এর প্রভাব কেবল মধ্যপ্রাচ্যে নয়, সারা বিশ্বের অর্থনীতি ও রাজনীতিতেই অনুভূত হবে।

