পাকিস্তানের ইসলামাবাদে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত কূটনৈতিক আলোচনা কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয়েছে। তবে এই অচলাবস্থার মধ্যেও আশার আলো দেখছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তিনি জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন যদি তাদের ‘স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাব’ এবং আধিপত্য বিস্তারের নীতি পরিহার করে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এখনো একটি অর্থবহ সমঝোতা চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব।
সোমবার (১৩ এপ্রিল ২০২৬) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বার্তায় প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান তেহরানের এই অবস্থান স্পষ্ট করেন। গত ১১ এপ্রিল ইসলামাবাদে দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে টানা ২১ ঘণ্টার ম্যারাথন বৈঠক ব্যর্থ হওয়ার পর এটিই ছিল ইরানি শীর্ষ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে প্রথম কোনো সরাসরি প্রতিক্রিয়া।
জাতীয় অধিকারের প্রশ্নে আপসহীন তেহরান প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান তার বার্তায় উল্লেখ করেন, মার্কিন সরকারকে অবশ্যই ইরানের জনগণের জাতীয় অধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে হবে। তিনি লিখেছেন, “যদি মার্কিন প্রশাসন তাদের একপাক্ষিক ও স্বৈরতান্ত্রিক মানসিকতা থেকে সরে আসে, তবেই একটি স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছানোর পথ তৈরি হবে।”
একই সঙ্গে তিনি ইসলামাবাদ সংলাপে অংশ নেওয়া ইরানি প্রতিনিধি দলের সদস্যদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন। বিশেষ করে পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের কালিবাফকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, “আমার প্রিয় ভাই কালিবাফসহ প্রতিনিধি দলের সকলকে অভিনন্দন জানাই। দেশের স্বার্থ রক্ষায় আপনাদের প্রচেষ্টায় ঈশ্বর শক্তি দান করুন।”
সংঘাত ও রক্তক্ষয়ী ফেব্রুয়ারির ক্ষত
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার এই দ্বন্দ্ব গত দুই দশকের পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে আবর্তিত হলেও, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তা চরম আকার ধারণ করে। গত ৬ থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত টানা ২১ দিন সংলাপ চললেও কোনো ফলাফল না আসায় ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানজুড়ে ভয়াবহ সামরিক অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।
‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ এবং ‘অপারেশন রোয়ারিং লায়ন’ নামের সেই যৌথ অভিযানে ইরান অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হয়। যুদ্ধের প্রথম দিনেই প্রাণ হারান ইরানের আধ্যাত্মিক ও সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। ৩৯ দিন ধরে চলা সেই রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ে খামেনি ছাড়াও ইরান সরকারের বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এবং নীতিনির্ধারক নিহত হন।
ইসলামাবাদ সংলাপ ও বর্তমান পরিস্থিতি
গত ৭ এপ্রিল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপে দুই দেশ সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করলে যুদ্ধের বিভীষিকা কিছুটা থিতু হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১১ এপ্রিল পাকিস্তানের ইসলামাবাদে দুই দেশের প্রতিনিধিরা মুখোমুখি বসেছিলেন। কিন্তু ২১ ঘণ্টার নিবিড় আলোচনার পর মার্কিন প্রতিনিধিদের অনড় অবস্থান এবং বাড়তি কিছু শর্তের কারণে কোনো সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষর করা সম্ভব হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের এই বার্তা একদিকে যেমন আলোচনার পথ খোলা রাখার ইঙ্গিত দিচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি দেশীয় রাজনীতিতে কট্টরপন্থীদের শান্ত রাখার একটি কৌশল। কারণ, শীর্ষ নেতৃত্বের মৃত্যু এবং সামরিক পরাজয়ের পর ইরানি জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যখন ওয়াশিংটন থেকে ‘সব বিকল্প খোলা রাখা’র হুমকি দিচ্ছেন, তখন পেজেশকিয়ানের এই ‘স্বৈরতন্ত্র বনাম অধিকার’ বয়ান মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ কূটনীতিকে কোন দিকে নিয়ে যায়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

