পাকিস্তানের ইসলামাবাদে দুই দেশের মধ্যকার উচ্চপর্যায়ের আলোচনা কোনো সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয়েছে। তবে এই কূটনৈতিক ব্যর্থতা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান ১৪ দিনের অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি এখনো ‘খুব ভালোভাবেই কার্যকর’ রয়েছে বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
গতকাল রোববার (১২ এপ্রিল ২০২৬) ফ্লোরিডায় সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময়কালে ট্রাম্প এই মন্তব্য করেন। ইসলামাবাদে কোনো সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত না হওয়ায় যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়ে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, প্রেসিডেন্টের এই বক্তব্যে তা কিছুটা স্তিমিত হলো। তবে তার সুর ছিল বরাবরের মতোই কঠোর ও আক্রমণাত্মক।
‘তাদের নৌবাহিনী এখন পানির নিচে’ সাংবাদিকরা যখন প্রশ্ন করেন যে, আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর যুদ্ধবিরতি অব্যাহত থাকবে কি না, জবাবে ট্রাম্প বলেন, “আমি মনে করি এটি খুব ভালোভাবেই কার্যকর থাকবে। তারা (ইরান) এখন কোনো শক্তিশালী অবস্থানে নেই। তাদের সেনাবাহিনী ধ্বংস হয়ে গেছে এবং তাদের পুরো নৌবাহিনী এখন পানির নিচে।”
ট্রাম্পের এই মন্তব্য গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানে চালানো মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলার ভয়াবহতার দিকেই ইঙ্গিত করছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি বহাল রাখার কথা বললেও তেহরানের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টির কোনো সুযোগই হাতছাড়া করছেন না।
রক্তক্ষয়ী ফেব্রুয়ারি ও সর্বোচ্চ নেতার প্রয়াণ
ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে দুই দেশের মধ্যে গত দুই দশক ধরে চলা বিরোধ চলতি বছরের শুরুতে এক চরম সংঘাতের রূপ নেয়। ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত টানা ২১ দিন আলোচনা চললেও দুই পক্ষ কোনো ঐকমত্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়।
এর ঠিক একদিন পর, ২৮ ফেব্রুয়ারি ভোরে মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু করে। একই সময়ে ইসরায়েল চালায় ‘অপারেশন রোয়ারিং লায়ন’। যুদ্ধের প্রথম দিনেই তেহরানে ভয়াবহ হামলায় নিহত হন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। ৩ দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশটির ক্ষমতায় থাকা এই নেতার সঙ্গে তার পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্যও প্রাণ হারান। এই আকস্মিক নেতৃত্বশূন্যতা এবং সামরিক ক্ষয়ক্ষতি ইরানকে এক নজিরবিহীন সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়।
শান্তি আলোচনা ও বর্তমান পরিস্থিতি
আন্তর্জাতিক মহলের ব্যাপক তৎপরতায় গত ৭ এপ্রিল দুই দেশ ১৪ দিনের একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়। এরই অংশ হিসেবে ১১ এপ্রিল ইসলামাবাদের একটি নিরপেক্ষ ভেন্যুতে ২১ ঘণ্টা ধরে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন দুই দেশের প্রতিনিধিরা। কিন্তু ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, শেষ মুহূর্তে মার্কিন প্রতিনিধিদের ‘চরম অবস্থান’ এবং আলোচনার মোড় পরিবর্তন করায় কোনো ‘ইসলামাবাদ মেমোর্যান্ডাম’ স্বাক্ষর করা সম্ভব হয়নি।
হোয়াইট হাউস থেকে জানানো হয়েছে, ইরান যদি তাদের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ত্যাগ না করে, তবে আলোচনার পথ সংকুচিত হয়ে আসবে। অন্যদিকে, ইরান বলছে তারা সম্মানের সঙ্গে শান্তি চায়, চাপের মুখে নয়।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ কিছুটা শান্ত থাকলেও হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন নৌ-অবরোধের ঘোষণা এবং ইসলামাবাদে সংলাপ ব্যর্থ হওয়া—সব মিলিয়ে এক চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে। ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী যুদ্ধবিরতি আপাতত বহাল থাকলেও, ১৪ দিনের এই সময়সীমা শেষ হওয়ার পর দুই দেশ আবার পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়াবে কি না, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

