পাকিস্তানের ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার ২৪ ঘণ্টা পার হতে না হতেই ইরানের বিরুদ্ধে আরও আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইসলামাবাদ মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং (এমওইউ) স্বাক্ষরে তেহরানের ‘অনীহা’ এবং পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ত্যাগ না করার অভিযোগে ট্রাম্প এখন ইরানে পুনরায় বিমান হামলা চালানোর কথা ভাবছেন।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ রবিবার এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, হোয়াইট হাউসের নীতি-নির্ধারকরা ইরানে নতুন করে সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা সাজাচ্ছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে সংবাদপত্রটি জানায়, হরমুজ প্রণালীতে নৌ-অবরোধ কার্যকর করার পাশাপাশি নির্দিষ্ট সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলার বিষয়টিও প্রেসিডেন্টের বিবেচনাধীন রয়েছে।
হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন কড়াকড়ি হোয়াইট হাউসের নির্দেশের পরপরই মার্কিন সামরিক বাহিনী ঘোষণা করেছে যে, সোমবার স্থানীয় সময় সকাল ১০টা থেকে ইরানি বন্দরগুলোতে কঠোর অবরোধ শুরু হবে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার নিজস্ব সামাজিক মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ এক পোস্টে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, মার্কিন নৌবাহিনী হরমুজ প্রণালীতে প্রবেশ করা বা ছেড়ে যাওয়া যেকোনো জাহাজকে চ্যালেঞ্জ করবে।
যদিও ওয়াশিংটন দাবি করেছে তারা তৃতীয় দেশের বাণিজ্যিক জাহাজে বাধা দেবে না, তবুও এই উত্তেজনার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতিতে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আবারও ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা বিশ্বজুড়ে নতুন করে মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা জাগিয়ে তুলছে।
‘তারা ফিরুক বা না ফিরুক, কিছু যায় আসে না’
মেরিল্যান্ডের জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত কঠোর ভাষায় কথা বলেন। ইসলামাবাদে আলোচনা ভেস্তে যাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “ইরান যদি এখন আলোচনায় ফিরতে না চায়, তাতে আমার কিচ্ছু যায় আসে না। আমি এতে ঠিক আছি (আই অ্যাম ফাইন)।” ট্রাম্পের দাবি, তেহরান এখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির স্বপ্নে বিভোর এবং ইসলামাবাদের টেবিলে তারা সেই ইচ্ছারই প্রতিফলন ঘটিয়েছে।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনটি নিয়ে সরাসরি মন্তব্য না করলেও তিনি জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্টের কাছে সব বিকল্প পথই খোলা রয়েছে। তিনি একে ইরানের ‘চাঁদাবাজি’ বন্ধের একটি কৌশল হিসেবে বর্ণনা করেন। তবে তেহরানের পক্ষ থেকে এর কড়া জবাব দেওয়া হয়েছে। ইরানি সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, মার্কিন হুমকির মুখে তেহরান কখনোই নতি স্বীকার করবে না।
স্নায়ুযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে মধ্যপ্রাচ্য
এদিকে ইরানের প্রভাবশালী সামরিক বাহিনী ‘ইসলামিক রেভুলেশনারি গার্ড কোর’ (আইআরজিসি) এক বিবৃতিতে হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, হরমুজ প্রণালীর আশেপাশে আসা যেকোনো প্রতিকূল সামরিক জাহাজের বিরুদ্ধে তারা কঠোর ব্যবস্থা নিতে দ্বিধা করবে না। উল্লেখ্য, এই নৌপথ দিয়েই বিশ্বের মোট ব্যবহৃত তেলের একটি বিশাল অংশ পরিবাহিত হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, ৪৭ বছর পর প্রথমবারের মতো সরাসরি আলোচনা শুরু হলেও তা মাঝপথে ভেঙে যাওয়ায় পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। গত ফেব্রুয়ারিতে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র মাধ্যমে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে আঘাত করার পর এবার ট্রাম্প প্রশাসন তেহরানের অর্থনীতি ও সামরিক অবকাঠামোকে পুরোপুরি পঙ্গু করে দেওয়ার কৌশল নিচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
দুই দেশের এই একগুঁয়েমি এবং ক্রমবর্ধমান সামরিক তৎপরতা মধ্যপ্রাচ্যকে এক দীর্ঘস্থায়ী ও ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে কি না, এখন সেটিই বড় প্রশ্ন।

