ইসলামাবাদে দীর্ঘ ২১ ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস বৈঠকের ফলাফল যখন ‘শূন্য’, তখন ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য ক্ষোভ উগরে দিল ইরান। দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ এক কড়া বার্তায় জানিয়েছেন, মার্কিনিদের ওপর তেহরানের বিন্দুমাত্র আস্থা নেই এবং এই আলোচনাতেও তারা নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রমাণ করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
রোববার বিকেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে ঘালিবাফ স্পষ্ট করে বলেন, আলোচনার জন্য ইরানের যথেষ্ট সদিচ্ছা এবং ইতিবাচক মনোভাব ছিল। কিন্তু গত দুই যুদ্ধের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে তারা শিখেছেন যে, ওয়াশিংটনের প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবতার মধ্যে দুস্তর ব্যবধান থাকে।
আস্থার সংকট ও পুরনো ক্ষোভ
ঘালিবাফের এই মন্তব্য মূলত গত দুই দশকের বৈরী সম্পর্কেরই প্রতিফলন। ইসলামাবাদে মার্কিন প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকের পর এটিই তেহরানের পক্ষ থেকে উচ্চপর্যায়ের প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া। স্পিকারের দাবি, আলোচনার টেবিলে যুক্তরাষ্ট্র এমন সব দাবি তুলেছিল যা আদতে ইরানের জন্য অবমাননাকর।
তিনি লেখেন, “আমাদের প্রয়োজনীয় মনোভাব ও সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও আমরা কোনো সমাধানে পৌঁছাতে পারিনি। কারণ মার্কিনিরা এই পর্বেও ইরানি প্রতিনিধিদের আস্থা অর্জন করতে পারেনি। তাদের পূর্বের কর্মকাণ্ড আমাদের বিশ্বাসের জায়গাটুকু ধ্বংস করে দিয়েছে।”
পাকিস্তানের প্রতি কৃতজ্ঞতা
ব্যর্থ আলোচনার দায়ভার পুরোপুরি ওয়াশিংটনের ওপর চাপালেও, আয়োজক দেশ পাকিস্তানের প্রতি অকুণ্ঠ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন ঘালিবাফ। তিনি পাকিস্তানকে ‘ভাতৃপ্রতীম দেশ’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, ইসলামাবাদ যে আন্তরিকতায় এই আলোচনার ব্যবস্থা করেছিল, তা প্রশংসার দাবিদার।
তিনি আরও যোগ করেন, “আমি পাকিস্তানের জনগণ এবং সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞ। তারা এই সংকটের মুহূর্তে দুই পক্ষকে এক টেবিলে আনার জন্য অভাবনীয় পরিশ্রম করেছে।” কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ঘালিবাফের এই মন্তব্য পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকাকে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের অনড় অবস্থানকে আরও বেশি করে ফুটিয়ে তুলেছে।
যুদ্ধবিরতি ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
উল্লেখ্য, শনিবার সন্ধ্যায় শুরু হওয়া এই ম্যারাথন বৈঠকটি কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়। বর্তমানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দুই সপ্তাহের একটি যুদ্ধবিরতি চলছে, যা আগামী কয়েক দিনের মধ্যে শেষ হতে যাচ্ছে। এই সময়সীমার মধ্যে কোনো সমাধান না আসায় মধ্যপ্রাচ্যে পুনরায় বড় ধরনের সংঘাতের মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে।
ইরানি প্রতিনিধি দলের দাবি, ওয়াশিংটন তাদের পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে এমন সব ‘অতিরিক্ত দাবি’ করেছে, যা কোনো স্বাধীন রাষ্ট্রের পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। ফলে কোনো কার্যকর রোডম্যাপ ছাড়াই মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স এবং তার দল তেহরানের জন্য একটি ‘চূড়ান্ত প্রস্তাব’ রেখে দেশে ফিরে গেছেন।
কূটনৈতিক অচলাবস্থা বনাম রণক্ষেত্র
ঘালিবাফের এই কঠোর বার্তার পর এখন প্রশ্ন উঠছে—তবে কি আলোচনার পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেল? ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকারের ভাষায় আস্থার যে অভাব ফুটে উঠেছে, তা দূর করা বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রায় অসম্ভব বলে মনে করছেন অনেক বিশেষজ্ঞ।
সংলাপের টেবিলে যখন অবিশ্বাস আর শর্তের পাহাড় জমে থাকে, তখন শেষ পর্যন্ত ফয়সালা হয় রণক্ষেত্রেই—ইতিহাস বারবার এমনটাই বলে এসেছে। এখন দেখার বিষয়, দুই সপ্তাহের এই ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তেহরান এবং ওয়াশিংটন পুনরায় আক্রমণের পথে হাঁটে, নাকি পর্দার আড়ালে নতুন কোনো কূটনৈতিক চাল অপেক্ষা করছে। তবে ঘালিবাফের আজকের বক্তব্য এই বার্তাই দিচ্ছে যে, তেহরান এখন আর ‘সাদা কাগজে’ ওয়াশিংটনকে বিশ্বাস করতে রাজি নয়।

