ইসলামাবাদের রুদ্ধশ্বাস আলোচনার টেবিল থেকে মার্কিন প্রতিনিধি দল বিদায় নেওয়ার কয়েক ঘণ্টা কাটতে না কাটতেই পাল্টা মুখ খুলল ইরান। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স যখন কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে না পারার জন্য আক্ষেপ প্রকাশ করছেন, ঠিক তখনই তেহরান দাবি করেছে যে—যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের ময়দানে যা হাসিল করতে ব্যর্থ হয়েছে, তা এখন কূটনীতির আবরণে কেড়ে নিতে চাইছে।
২১ ঘণ্টার দীর্ঘ ম্যারাথন বৈঠক কেন ব্যর্থ হলো, তা নিয়ে এখন দুই মেরু থেকে দুই ধরনের দাবি উঠে আসছে। ইরান সরকারের ঘনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যম ফার্স নিউজ তাদের এক প্রতিবেদনে প্রতিনিধি দলের সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, মূলত যুক্তরাষ্ট্রের ‘উচ্চাকাঙ্ক্ষী’ এবং ‘অযৌক্তিক’ শর্তের কারণেই এই শান্তি আলোচনা মুখ থুবড়ে পড়েছে।
যুদ্ধের অপূর্ণ লক্ষ্য কি কূটনীতিতে সম্ভব?
ইরানি প্রতিনিধি দলের একজন জ্যেষ্ঠ সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, আলোচনার টেবিলে ওয়াশিংটন এমন কিছু শর্ত জুড়ে দিয়েছিল যা ইরানের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হানে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এবং ইরানের পরমাণু প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুই পক্ষ কোনোভাবেই একমত হতে পারেনি।
ইরানি সূত্রের ভাষ্যমতে, “যুক্তরাষ্ট্র ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র মাধ্যমে রণক্ষেত্রে যা অর্জন করতে পারেনি, আলোচনার টেবিলে তারা সেই সব কিছুর দখল চেয়েছিল। তাদের এই একতরফা আধিপত্যকামী মানসিকতাই আলোচনার পথ রুদ্ধ করে দিয়েছে।” তেহরানের এই বক্তব্য থেকে পরিষ্কার যে, সামরিক চাপের মুখে পড়ে তারা কোনো নতিস্বীকার করতে রাজি নয়।
সংঘাতের এক দীর্ঘ পরিক্রমা
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের এই সংঘাত কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। গত দুই দশক ধরে ইরানের পরমাণু প্রকল্প এবং ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে ওয়াশিংটনের সাথে তাদের চরম বিরোধ চলছে। সেই বিরোধ মেটাতে চলতি বছরের ৬ থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত টানা ২১ দিন সংলাপ চলেছিল। কিন্তু ফলাফল ছিল শূন্য।
সেই সংলাপ ব্যর্থ হওয়ার ঠিক পরদিন, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানে শুরু হয় মার্কিন সামরিক অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’। একই তালে ইসরায়েলও শুরু করে তাদের নিজস্ব অভিযান ‘অপারেশন রোয়ারিং লায়ন’। কয়েক সপ্তাহের রক্তক্ষয়ী সংঘাত আর ধ্বংসলীলার পর গত ৭ এপ্রিল আন্তর্জাতিক চাপে দুই দেশ যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করতে বাধ্য হয়।
কেন পৌঁছানো গেল না কোনো সিদ্ধান্তে?
গত ১১ এপ্রিল ইসলামাবাদের শান্ত পরিবেশে যখন দুই পক্ষ আবার মুখোমুখি বসল, তখন বিশ্ব আশা করেছিল হয়তো এবার একটি স্থায়ী সমাধান আসবে। কিন্তু পর্দার আড়ালের খবর বলছে ভিন্ন কথা। ইরান মনে করে, তাদের শান্তিপূর্ণ পরমাণু প্রকল্পের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া বা হরমুজ প্রণালির মতো কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ জলপথের নিয়ন্ত্রণ চাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের একটি দীর্ঘমেয়াদী ষড়যন্ত্র।
অন্যদিকে, ওয়াশিংটনের দাবি ছিল ইরানকে তার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে। তেহরানের পক্ষ থেকে সাফ জানানো হয়েছে যে, আত্মরক্ষার স্বার্থে তারা কোনোভাবেই এই কর্মসূচি থেকে পিছু হটবে না। এই অনমনীয় অবস্থানই শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিলকে একটি অচলাবস্থার দিকে ঠেলে দেয়।
অনিশ্চয়তার মুখে মধ্যপ্রাচ্য
ইসলামাবাদের এই আলোচনার ব্যর্থতা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে আবারও এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিল। যদিও যুদ্ধবিরতি এখনো কাগজে-কলমে বলবৎ আছে, তবে দুই পক্ষের বাদানুবাদ নতুন করে যুদ্ধের উসকানি দিচ্ছে বলে মনে করছেন সমর বিশেষজ্ঞরা।
মার্কিন প্রতিনিধি দল পাকিস্তান ছেড়ে গেলেও তেহরান এখন তাদের পরবর্তী পদক্ষেপের প্রস্তুতি নিচ্ছে। যদি আলোচনার দরজা সত্যিই বন্ধ হয়ে যায়, তবে পুনরায় শুরু হতে পারে সেই ভয়াবহ ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’।
ইসলামাবাদ থেকে রিক্ত হাতে ফিরে যাওয়া দুই পক্ষের জন্যই এক বড় রাজনৈতিক পরাজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে পাকিস্তানের মতো মধ্যস্থতাকারী দেশের জন্য এটি একটি হতাশাজনক অধ্যায়। এখন দেখার বিষয়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আবারও কোনো নতুন আলোচনার উদ্যোগ নেয় নাকি পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে আবার বাজবে যুদ্ধের দামামা।

