ইসলামাবাদে যখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের মধ্যে ঐতিহাসিক শান্তি আলোচনার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে, ঠিক তখনই নিজের স্বভাবজাত ভঙ্গিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঝড় তুললেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিজের প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি দাবি করেছেন, ইরানের দীর্ঘদিনের পুরোনো নেতৃত্ব এখন ইতিহাস এবং দেশটির সামরিক সক্ষমতা কার্যত নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার পোস্টে ধর্মীয় আবেগ মিশিয়ে লিখেছেন, “ইরানের পুরোনো নেতারা আর আমাদের সাথে নেই (বেঁচে নেই)। মহান আল্লাহর প্রশংসা।” তেহরানের বর্তমান নেতৃত্বের পরিবর্তনের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি এই মন্তব্য করেন। উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলি ও মার্কিন হামলায় ইরানের শীর্ষ পর্যায়ের প্রায় সব নেতা নিহত হওয়ার পর দেশটিতে এক বিশাল রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছিল।
পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলোতে ইরানের কৌশলগত অবস্থানের প্রশংসা করা হলেও ট্রাম্প তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি লিখেছেন, “মিডিয়ায় দেখানো হচ্ছে ইরান জিতছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—তারা হারছে, এবং অনেক বড়ভাবে হারছে।” তার দাবি অনুযায়ী, ইরানের নৌবাহিনী ধ্বংস হয়ে গেছে এবং বর্তমানে তাদের কোনো কার্যকর বিমানবাহিনী অবশিষ্ট নেই।
ট্রাম্পের বর্ণনায় ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এখন ‘মৃত’। তিনি দাবি করেন, দেশটির বিমান বিধ্বংসী ব্যবস্থা এবং রাডার পুরোপুরি অকেজো হয়ে পড়েছে। এমনকি ইরানের গর্ব করার মতো ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন তৈরির কারখানাগুলোও এখন ধ্বংসস্তূপ। এই সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করে ট্রাম্প মূলত শান্তি আলোচনার টেবিলে বসা ইরানি প্রতিনিধিদের ওপর চূড়ান্ত মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করতে চাইছেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
পোস্টের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ নিয়ে। ট্রাম্প অভিযোগ করেন, ইরান ওই সমুদ্রপথে বিপুল পরিমাণ সামুদ্রিক মাইন স্থাপন করেছে, যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য হুমকি। যদিও বর্তমানে প্রণালিটি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডের (IRGC) নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, তবে ট্রাম্প দাবি করেছেন যে বিশ্বের স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যেই সেসব মাইন অপসারণের কাজ শুরু করে দিয়েছে।
হোয়াইট হাউসের এই নেতিবাচক ও কঠোর বার্তার পর ইসলামাবাদের শান্তি আলোচনার ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। কূটনীতিকরা মনে করছেন, একদিকে যখন জেডি ভ্যান্স সমঝোতার পথ খুঁজছেন, তখন ট্রাম্পের এই ‘বিজয়োল্লাস’ তেহরানের প্রতিনিধিদের ক্ষুব্ধ করতে পারে। বিশেষ করে ইরানের পুরোনো নেতাদের মৃত্যু নিয়ে ট্রাম্পের ‘আল্লাহর প্রশংসা’ করার বিষয়টি ধর্মীয় ও রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল।
ট্রাম্পের এই মন্তব্যের প্রেক্ষিতে এখন পর্যন্ত তেহরান বা ইসলামাবাদের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পোস্টটি কেবল প্রচারণার জন্য নয়, বরং এটি একটি পরিষ্কার বার্তা যে—আমেরিকা কোনো সমান্তরাল সমঝোতা নয়, বরং ‘শক্তি প্রদর্শনের’ মাধ্যমে নিজের শর্তগুলো চাপিয়ে দিতে চায়।

