দীর্ঘদিনের বৈরিতা কাটিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ফেরানোর এক নতুন সমীকরণের সাক্ষী হতে যাচ্ছে ইসলামাবাদ। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলগুলো ইতিমধ্যেই পাকিস্তানের রাজধানীতে এসে পৌঁছেছেন। এই সফরের মূল উদ্দেশ্য হলো দুই দেশের মধ্যে ঝুলে থাকা বিরোধগুলোর একটি কূটনৈতিক সমাধান খুঁজে বের করা।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে এই আলোচনার ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে নেপথ্যে থেকে কাজ করেছে পাকিস্তান। ওয়াশিংটন এবং তেহরান—উভয় পক্ষের সাথেই ইসলামাবাদের ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক এই মধ্যস্থতাকে সম্ভব করে তুলেছে। বিশেষ করে ইরানের সাথে পাকিস্তানের ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক নৈকট্য এই প্রক্রিয়ায় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পাকিস্তানের এই ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। সাম্প্রতিক এক বিবৃতিতে তিনি উল্লেখ করেন যে, পাকিস্তানের বর্তমান সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির ইরান পরিস্থিতি এবং তাদের মনস্তত্ত্ব অন্যান্যদের তুলনায় অনেক গভীরভাবে বোঝেন। ট্রাম্পের এই মন্তব্য ইসলামাবাদের কূটনৈতিক গুরুত্বকে বিশ্বমঞ্চে নতুন করে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
শান্তি আলোচনার এই টেবিলে ইরানের পক্ষ থেকে ১০ দফার একটি প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই প্রস্তাবনাকে ‘আলোচনার জন্য একটি কার্যকর ভিত্তি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। যদিও এই প্রস্তাবের বিস্তারিত এখনো গোপন রাখা হয়েছে, তবে মার্কিন প্রশাসনের ইতিবাচক সংকেত নতুন আশার সঞ্চার করছে।
অন্যদিকে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ১৫ দফার একটি পৃথক রূপরেখা নিয়ে কাজ করছেন। ট্রাম্পের প্রধান আলোচক দল মনে করছেন, এই ১৫ দফার মধ্যেই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের অবসানের সূত্র লুকিয়ে থাকতে পারে। তবে কোনো পক্ষই এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রস্তাবগুলো সংবাদমাধ্যমের সামনে প্রকাশ করেনি।
গোপনীয়তা বজায় থাকলেও কিছু অসমর্থিত সূত্র বলছে, প্রস্তাবগুলোর মূল নজর পরমাণু চুক্তি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তবে বিবিসির কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আলোচনার টেবিলে উভয় পক্ষ বসলেও তাদের মৌলিক অবস্থানের মধ্যে এখনো বিস্তর ফারাক রয়ে গেছে। এই দূরত্ব ঘুচিয়ে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানো ইসলামাবাদের জন্য এক কঠিন পরীক্ষা।
এদিকে, যখন ইসলামাবাদে শান্তির সুবাতাস বইছে, ঠিক তখনই লেবানন সীমান্তে সংঘাতের তীব্রতা পুরো আলোচনার ওপর কালো মেঘের ছায়া ফেলেছে। ইসরায়েলি বাহিনীর সাম্প্রতিক বিমান হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আবারও অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, কোনো সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি লেবাননের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার দেশটির বিভিন্ন স্থানে চালানো সামরিক অভিযানে তিন শতাধিক বেসামরিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার শান্তি আলোচনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে। তেহরান এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে ওয়াশিংটনের ভূমিকার ওপর নজর রাখছে।
তবে সংকটের মধ্যেও আশার আলো দেখছেন অনেকে। লেবানন সরকার শুক্রবার সন্ধ্যায় ঘোষণা করেছে যে, তারা আগামী সপ্তাহে ওয়াশিংটনে ইসরায়েলের সাথে সরাসরি যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনায় বসতে যাচ্ছে। এই দ্বিমুখী কূটনৈতিক তৎপরতা মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র বদলে দিতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
ইসলামাবাদের এই আলোচনার ফলাফল কী হবে, তা এখনো অনিশ্চিত। কিন্তু পাকিস্তান যেভাবে নিজেকে একটি বৈশ্বিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তুলে ধরেছে, তা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে তাদের অবস্থানকে শক্তিশালী করছে। জেনারেল আসিম মুনিরের কৌশলগত নেতৃত্ব এবং ট্রাম্প প্রশাসনের নমনীয়তা—এই দুইয়ের সমন্বয়ে তেহরান ও ওয়াশিংটনের বরফ কতটুকু গলে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক কেবল দ্বিপাক্ষিক বিষয় নয়, বরং এটি সারা বিশ্বের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সাথে জড়িত। যদি ইসলামাবাদে কোনো কার্যকর ঐকমত্য তৈরি হয়, তবে তা হবে বর্তমান দশকের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক সাফল্য। কিন্তু লেবাননের ধ্বংসস্তূপ আর তেহরানের জেদ যদি সমান্তরালে চলে, তবে শান্তির পথ আরও দীর্ঘ হতে পারে।
এই মুহূর্তে ইসলামাবাদের কূটনৈতিক পাড়া কড়া নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা। পর্দার আড়ালে চলছে ড্রাফটিং আর দরকষাকষি। প্রস্তাবের খসড়াগুলোতে কী আছে, তা হয়তো খুব শীঘ্রই জানা যাবে। তবে আপাতত বিশ্ববাসীর চোখ পাকিস্তানের দিকে, যেখানে নির্ধারিত হতে পারে আগামীর বিশ্ব রাজনীতির নতুন গতিপথ।
সব মিলিয়ে, ইসলামাবাদ এখন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে ইরানের নিরাপত্তা উদ্বেগ, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থ—এই দুই বিপরীতমুখী স্রোতকে এক মোহনায় আনা পাকিস্তানের জন্য যেমন সম্মানের, তেমনি ঝুঁকিরও। এই আলোচনার প্রতিটি পদক্ষেপই অত্যন্ত সংবেদনশীল, যা সফল হলে পুরো অঞ্চল এক নতুন ভোরের দেখা পাবে।

