দীর্ঘ ৪০ দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর শান্তির যে ক্ষীণ আশা দেখা দিয়েছিল, তা যেন মুহূর্তেই ফিকে হয়ে গেল। পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে আজ শুক্রবার ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। তবে শেষ মুহূর্তে তেহরানের সরে দাঁড়ানোর খবরে পুরো প্রক্রিয়াটি এখন গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমগুলোর দাবি অনুযায়ী, এই সংলাপ স্থগিত করার পেছনে লেবানন ইস্যু একটি বড় কারণ হিসেবে কাজ করছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ভয়াবহ যুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ব্যাপক চাপে দুই সপ্তাহ আগে একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়েছিল। লক্ষ্য ছিল, এই ১৪ দিনের বিরতিকে কাজে লাগিয়ে একটি স্থায়ী সমাধানের পথ খুঁজে বের করা। সেই ধারাবাহিকতায় আজকের এই ‘ইসলামাবাদ সংলাপ’ ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কিন্তু বৃহস্পতিবার রাত থেকেই ঘটনাপ্রবাহ দ্রুত মোড় নিতে শুরু করে।
পাকিস্তানে নিযুক্ত ইরানি রাষ্ট্রদূত রেজা আমিরি মোঘাদাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ এক বার্তায় জানিয়েছিলেন যে, ইরানি প্রতিনিধি দল ইসলামাবাদের পথে রওনা হচ্ছেন। কিন্তু রহস্যজনকভাবে কিছু সময় পরই তিনি সেই পোস্টটি মুছে ফেলেন। এরপর থেকে ইসলামাবাদে ইরানি প্রতিনিধিদের আগমনের কোনো প্রামাণিক তথ্য পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, মার্কিন প্রতিনিধি দলও এখনো সেখানে পৌঁছায়নি বলে জানা গেছে।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ‘কান’ এবং ‘জেরুজালেম পোস্ট’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান এখন শর্ত দিচ্ছে যে যেকোনো স্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে লেবাননকেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তেহরানের পক্ষ থেকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে যে, শুধু গাজা বা নির্দিষ্ট অঞ্চলে শান্তি বজায় রেখে লাভ নেই যদি লেবাননের ওপর ইসরায়েলি আগ্রাসন বন্ধ না হয়। লেবাননের সরকারি কর্মকর্তারাও এই সংলাপে অংশ নিতে এবং ইসরায়েলের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে আগ্রহী বলে জানা গেছে।
পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে গত ৮ এপ্রিল, যখন অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি ঘোষণার মাত্র এক দিন পরেই লেবাননের ওপর ভয়াবহ বিমান হামলা চালায় ইসরায়েল। সেই হামলায় অন্তত ২৫৪ জন প্রাণ হারান এবং আহত হন এক হাজার একশোরও বেশি মানুষ। নিহতদের অধিকাংশই ছিলেন বেসামরিক নাগরিক, যা ইরানকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। তেহরান মনে করছে, একদিকে শান্তির কথা বলে অন্যদিকে প্রতিবেশী দেশে হামলা চালানো ইসরায়েলের দ্বিমুখী নীতি।
ইসলামাবাদের কূটনৈতিক পাড়ায় এখন চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি না দিলেও, কর্মকর্তারা আড়ালে স্বীকার করছেন যে বৈঠকের পরিবেশ বর্তমানে নেই। একটি সফল সংলাপের জন্য যে নূন্যতম আস্থার প্রয়োজন ছিল, সাম্প্রতিক বিমান হামলার পর তা পুরোপুরি ধসে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রও এই মুহূর্তে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং তারা তেহরানের পরবর্তী পদক্ষেপের অপেক্ষায় রয়েছে।
এই সংলাপ স্থগিত হওয়ার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে পুনরায় বড় ধরনের যুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে লেবানন সীমান্ত যদি নতুন যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়, তবে তা পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে বিপন্ন করবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান আসলে পশ্চিমাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চাইছে যাতে ইসরায়েলকে লেবাননের ওপর হামলা চালানো থেকে বিরত রাখা যায়। এটি এখন কেবল দুটি দেশের বিষয় নয়, বরং একটি আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক দাবার চালে পরিণত হয়েছে।
এদিকে, গাজা ও পার্শ্ববর্তী এলাকার সাধারণ মানুষ যারা দুই সপ্তাহের এই শান্তিতে কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল, তারা এখন চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। স্থায়ী শান্তির সম্ভাবনা যদি ভেস্তে যায়, তবে আগামিকাল থেকেই পুনরায় শুরু হতে পারে কামানের গর্জন। আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে যে, নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে মানবিক বিপর্যয় সামাল দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে।
ওয়াশিংটন এই স্থগিতাদেশকে কীভাবে দেখছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের একটি সূত্র ইঙ্গিত দিয়েছে যে, তারা কূটনৈতিক চ্যানেলগুলো খোলা রাখতে চায়। তারা মনে করে, সাময়িকভাবে বৈঠক পিছিয়ে গেলেও আলোচনার টেবিলই হচ্ছে সংকটের একমাত্র সমাধান। কিন্তু ইরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, লেবাননের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তারা কোনো চুক্তিতে সই করবে না।
ইসলামাবাদে এই মুহূর্তে কোনো প্রতিনিধি না থাকায় হোটেলের লবিগুলো ফাঁকা পড়ে আছে। যে শহরটি আজ বিশ্বের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণের সাক্ষী হওয়ার কথা ছিল, সেখানে এখন কেবল স্তব্ধতা। কূটনীতির এই জটিল মারপ্যাঁচে শেষ পর্যন্ত কার জয় হবে, তা বলা মুশকিল। তবে এটা নিশ্চিত যে, মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ থেকে কালো মেঘ সরতে এখনো অনেকটা সময় বাকি।
বিশ্বের শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো এখন তাকিয়ে আছে তেহরান ও ওয়াশিংটনের পরবর্তী বার্তার দিকে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় এই উদ্যোগটি পুনরায় প্রাণ পায় কি না, নাকি এটি ইতিহাসের আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়, তা আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই পরিষ্কার হয়ে যাবে। তবে বর্তমান বাস্তবতায় শান্তির চেয়ে যুদ্ধের দামামাই বেশি জোরালোভাবে শোনা যাচ্ছে।
লেবাননের ট্র্যাজেডি এবং ইসলামাবাদের এই কূটনৈতিক ব্যর্থতা প্রমাণ করে যে, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে শান্তি প্রতিষ্ঠা কতটা পিচ্ছিল পথ। একদিকে লাশের স্তূপ, অন্যদিকে বিলাসবহুল হোটেলের রুদ্ধদ্বার বৈঠক—এই দুইয়ের ব্যবধান যেন ক্রমেই বাড়ছে। ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের এই আস্থার সংকট শুধু তাদের দুই দেশের ক্ষতি করছে না, বরং কোটি কোটি সাধারণ মানুষের জীবনকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
আগামী দিনগুলোতে যদি কোনো অলৌকিক সমঝোতা না হয়, তবে ইসলামাবাদ সংলাপ স্থগিত হওয়া মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে একটি অন্ধকার অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। কূটনৈতিক তৎপরতা এখন আর কেবল আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন সরাসরি মাঠের পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে। শান্তি ফেরাতে হলে উভয় পক্ষকেই হয়তো আরও কিছু ছাড় দিতে হবে, যা এই মুহূর্তে সুদূরপরাহত মনে হচ্ছে।

