ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ৪০ দিনের রক্তক্ষয়ী ও বিধ্বংসী যৌথ অভিযানের পর হঠাৎ করে ঘোষিত যুদ্ধবিরতিকে এবার ‘মারাত্মক ভুল’ বা ‘মিসটেক’ বলে আখ্যা দিয়েছে ইসরাইল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার ৪৮ ঘণ্টা পার হওয়ার আগেই তেল আবিবের অভ্যন্তরে শুরু হয়েছে তীব্র সমালোচনা। ইসরাইলের বর্তমান ক্ষমতাসীন লিকুদ পার্টির প্রভাবশালী সদস্য এবং ডায়াসপোরা বিষয়ক মন্ত্রী আমিচাই চিকলি এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যম এবং ১০৩এফএম রেডিওকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে চিকলি এই যুদ্ধবিরতির কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি মনে করেন, তেহরান যখন প্রচণ্ড চাপের মুখে ছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে সামরিক অভিযান থামিয়ে দেওয়া কৌশলগতভাবে ইসরাইলের জন্য নেতিবাচক হতে পারে। চিকলি সরাসরি তুলনা টেনে বলেন, ‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানি সাম্রাজ্য কিংবা নাৎসি জার্মানিকে যেভাবে চূড়ান্ত আত্মসমর্পণে বাধ্য করা হয়েছিল, ইরানের ক্ষেত্রেও তেমনটি করা উচিত ছিল। তাদের হাঁটু গেড়ে বসতে বাধ্য না করা পর্যন্ত শান্তি স্থায়ী হবে না।’
এই যুদ্ধবিরতি কতদিন স্থায়ী হবে—তা নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করেছেন এই ইসরাইলি মন্ত্রী। তার মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে এই সমঝোতা টিকে থাকার সম্ভাবনা ‘ফিফটি-ফিফটি’ বা ৫০ শতাংশ। ইসরাইলের একটি বড় অংশ মনে করছে, তেহরান এই বিরতির সুযোগ নিয়ে নিজেদের সামরিক শক্তি পুনরায় গুছিয়ে নেবে, যা ভবিষ্যতে ইসরাইলের নিরাপত্তার জন্য আরও বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
উল্লেখ্য, ইরানের বিরুদ্ধে ৪০ দিনের টানা আগ্রাসনের পর বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের লক্ষ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্প হঠাৎ করেই এই যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন। বর্তমানে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি স্থায়ী শান্তিচুক্তি স্থাপনের জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে। এই প্রক্রিয়ায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে বড় ভূমিকা পালন করছে পাকিস্তান, তুরস্ক ও মিশর। ট্রাম্প প্রশাসন আশা করছে, এই আলোচনার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কোনো সংঘাতের দ্বার রুদ্ধ করা সম্ভব হবে।
তবে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকার এই শান্তি আলোচনাকে সহজভাবে নিতে পারছে না। যদিও ইসরাইল আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধবিরতি মেনে নিয়েছে, কিন্তু মন্ত্রিসভার সদস্যদের এমন প্রকাশ্যে বিরোধিতা বাইডেন-পরবর্তী ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে তেল আবিবের সম্পর্কের সমীকরণকে জটিল করে তুলতে পারে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইসরাইলি মন্ত্রীর এই বক্তব্য আসলে নেতানিয়াহুর ভেতরের অসন্তোষেরই প্রতিধ্বনি, যা তিনি তার কট্টরপন্থি মন্ত্রীদের মাধ্যমে প্রকাশ করছেন।
এদিকে, তেহরান এই যুদ্ধবিরতিকে তাদের কূটনৈতিক বিজয় হিসেবে দেখছে। অন্যদিকে, তুরস্ক ও মিশরের মতো মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো চাচ্ছে একটি টেকসই রোডম্যাপ তৈরি করতে, যাতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কয়েক দশকের শত্রুতা কমিয়ে আনা যায়। কিন্তু ইসরাইলি নীতিনির্ধারকদের একাংশের এই ‘শূন্য-সমষ্টির খেলা’ (Zero-sum game) নীতি মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে নতুন করে আশঙ্কার মেঘ জমাচ্ছে।
এখন দেখার বিষয়, ট্রাম্পের এই ‘পিস ডিল’ বা শান্তি প্রচেষ্টা ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ বিরোধিতাকে পাশ কাটিয়ে সফল হয় কি না, নাকি চিরবৈরী দুই দেশের মধ্যে পুনরায় আগুনের লেলিহান শিখা জ্বলে ওঠে।

