ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি নিয়ে যখন বিশ্বজুড়ে নানা সমীকরণ চলছে, ঠিক তখনই একে ওয়াশিংটনের ‘শোচনীয় পরাজয়’ হিসেবে আখ্যা দিল রাশিয়া। ক্রেমলিনের মতে, তেহরানের দেওয়া শর্তগুলো মেনে নিতে বাধ্য হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক ও সামরিক বিপর্যয়। রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সরাসরি জানিয়েছে, এই যুদ্ধে তথাকথিত ‘বিজয়’ নয়, বরং হোয়াইট হাউসের চরম ব্যর্থতাই প্রকাশ পেয়েছে।
বুধবার স্পুটনিক রেডিওকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা যুক্তরাষ্ট্রের কড়া সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যুদ্ধের হুমকি দেওয়া আর ‘বিজয় খুব কাছে’—এমন তর্জন-গর্জন করা যে শেষ পর্যন্ত কোনো কাজে আসে না, এই যুদ্ধবিরতি তারই প্রমাণ। জাখারোভার মতে, ওয়াশিংটনের একমুখী ও উসকানিমূলক হামলার কৌশল আবারও বিশ্বমঞ্চে মুখ থুবড়ে পড়েছে।
মস্কো শুরু থেকেই এই সংঘাতের বিরোধিতা করে আসছিল। জাখারোভা মনে করিয়ে দেন যে, রাশিয়া প্রথম থেকেই ইরানের ওপর ‘আগ্রাসন’ বন্ধ করে একটি বাস্তবসম্মত রাজনৈতিক সমাধানের তাগিদ দিয়ে আসছিল। তার ভাষায়, “যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণাত্মক অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের পিছু হটতে হলো।”
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই সংক্ষিপ্ত কিন্তু রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১,৩৪০-এর বেশি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে হামলা শুরু করার পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এর জবাবে ইরান যখন ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করে, তখন কেবল ইসরাইল নয়, জর্ডান, ইরাক ও উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোও চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়ে।
ইরান কেবল পাল্টা হামলাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, তারা বিশ্ব বাণিজ্যের ধমনী হিসেবে পরিচিত ‘হরমুজ প্রণালি’ কার্যত অচল করে দেয়। এই সাঁড়াশি চাপের মুখে পড়ে ওয়াশিংটনকে শেষ পর্যন্ত তেহরানের ১০ দফা শর্তের সামনে নতি স্বীকার করতে হয়েছে বলে দাবি করছে রাশিয়া। মস্কোর ধারণা, এই যুদ্ধবিরতি আসলে ওয়াশিংটনের জন্য একটি ‘সম্মানজনক প্রস্থানের’ পথ খোঁজা ছাড়া আর কিছুই নয়।
এদিকে মঙ্গলবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দুই সপ্তাহের জন্য বোমাবর্ষণ স্থগিত রাখার ঘোষণা দিলেও এটিকে ‘বিজয়’ হিসেবে প্রচার করছেন। কিন্তু রাশিয়ার বিশ্লেষণে উঠে এসেছে অন্য চিত্র। তারা মনে করছে, মধ্যপ্রাচ্যে ৯৫ শতাংশ মার্কিন সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস হওয়ার যে খবর ইরানি গণমাধ্যমগুলো দিচ্ছে, তার সত্যতা যাই হোক না কেন, রণক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ যে আলগা হয়েছে তা স্পষ্ট।
রাশিয়া এই দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানালেও তারা সতর্ক করেছে যে, ওয়াশিংটন যদি তাদের পুরোনো আক্রমণাত্মক নীতিতে ফিরে যায়, তবে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে। জাখারোভা বলেন, “শান্তির জন্য কেবল চুক্তি করলেই হয় না, অপর পক্ষের নায্য দাবিগুলোকেও সম্মান করতে হয়।”
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার এই প্রতিক্রিয়া মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্যের ক্ষয়িষ্ণু রূপটিকেই বিশ্বের সামনে তুলে ধরছে। চীন ও রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান প্রভাবের মাঝে যুক্তরাষ্ট্র এখন নিজেদের পুরোনো মিত্রদের কাছেও চাপের মুখে। আপাতত ১৪ দিনের এই বিরতি দুই পক্ষের জন্যই শক্তির পুনর্গঠন নাকি স্থায়ী শান্তির পথ, তা নিয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। তবে রাশিয়ার অবস্থান পরিষ্কার—এই যুদ্ধে ইরান নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রই রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে।

