দীর্ঘ উত্তেজনার পর অবশেষে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দুই সপ্তাহের একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হতে যাচ্ছে। যুদ্ধের দামামা কিছুটা স্তিমিত হওয়ার পরপরই এই সংঘাতের ফলাফল নিয়ে নিজের অনড় অবস্থানের কথা জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গতকাল মঙ্গলবার এক সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেছেন, এই সংক্ষিপ্ত কিন্তু তীব্র সংঘাতে ওয়াশিংটন শতভাগ জয়ী হয়েছে।
এএফপিকে দেওয়া ওই বিশেষ সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কণ্ঠে ছিল আত্মবিশ্বাসের সুর। তিনি কোনো রাখঢাক না করেই বলেন, “এটি আমাদের জন্য একটি সম্পূর্ণ এবং সর্বাত্মক বিজয়। এখানে দ্বিমত পোষণ করার মতো কোনো সুযোগ নেই। আমরা যা চেয়েছি, ঠিক তা-ই অর্জন করেছি।” ট্রাম্পের এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই বিরতিকে স্থায়ী শান্তিতে রূপান্তরের চেষ্টা চালাচ্ছে।
ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল গত মার্চের মাঝামাঝি সময়ে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরানকে ১৫ দফার একটি শান্তি প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তবে তেহরান প্রাথমিকভাবে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। এরপর হোয়াইট হাউজ থেকে একটি সংশোধিত প্রস্তাব পাঠানো হয়, যেখানে ৪৫ দিনের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব ছিল। কিন্তু ইরান সেই প্রস্তাবেও পুরোপুরি রাজি না হয়ে শেষ পর্যন্ত মাত্র দুই সপ্তাহের জন্য অস্ত্রবিরতিতে সম্মত হয়।
তেহরান মঙ্গলবার তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা জানানোর পর ট্রাম্প প্রশাসন তা গ্রহণ করে। বিশ্লেষকদের মতে, দুই সপ্তাহের এই স্বল্প সময় মূলত একটি পরীক্ষা। এই সময়ের মধ্যে আলোচনার টেবিলে কোনো অগ্রগতি না হলে পরিস্থিতি আবার ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। তবে ট্রাম্পের ‘বিজয়’ দাবির পেছনে তার আগের কঠোর হুঁশিয়ারিগুলো বড় ভূমিকা পালন করেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
চুক্তি হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্ত পর্যন্ত ট্রাম্পের সুর ছিল অত্যন্ত আক্রমণাত্মক। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন, ইরান যদি সমঝোতার টেবিলে না আসে, তবে দেশটির বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, গুরুত্বপূর্ণ সেতু এবং সব ধরনের জাতীয় অবকাঠামো গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে। মার্কিন সামরিক শক্তির এই প্রদর্শনীই কি তেহরানকে নরম হতে বাধ্য করেছে? ওয়াশিংটনের নীতি নির্ধারকদের বড় একটি অংশ তেমনটাই বিশ্বাস করেন।
সাক্ষাৎকারে যখন তাকে প্রশ্ন করা হয় যে, এই দুই সপ্তাহের মধ্যে যদি কোনো স্থায়ী সমাধান না আসে, তবে কি তিনি তার আগের হুমকিগুলো বাস্তবায়ন করবেন? ট্রাম্পের উত্তর ছিল বেশ কৌশলী। তিনি বলেন, “আপনাদের এখনই উত্তেজিত হওয়ার প্রয়োজন নেই, ধৈর্য ধরুন।” তিনি ইঙ্গিত দেন যে, পর্দার আড়ালে বড় ধরনের কূটনৈতিক খেলা চলছে যেখানে বেইজিংয়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ট্রাম্পের মতে, এবারের সংকটে চীন একটি বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করতে পারে। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, বেইজিং তাদের প্রভাব খাটিয়ে ইরানকে আলোচনার টেবিলে দীর্ঘমেয়াদে আটকে রাখতে সক্ষম হবে। “আমার বিশ্বাস, চীন এই ১৪ দিনে ইরানকে একটি স্থায়ী সমঝোতা চুক্তিতে পৌঁছাতে সহযোগিতা করবে,”—বলেন ট্রাম্প। মূলত মধ্যপ্রাচ্যে চীনের ক্রমবর্ধমান আধিপত্যকে ওয়াশিংটন এবার নিজেদের স্বার্থে ব্যবহারের একটি সুযোগ হিসেবে দেখছে।
তবে তেহরানের পক্ষ থেকে এখনো বিজয়ের দাবি বা পরাজয়ের গ্লানি—কোনোটিই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এই দুই সপ্তাহের বিরতিকে একটি কৌশলগত বিরতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। তাদের মূল লক্ষ্য সম্ভবত নিজেদের অবকাঠামো রক্ষা করা এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা থেকে কিছুটা শ্বাস নেওয়ার জায়গা তৈরি করা।
হোয়াইট হাউজের ভেতরেও এই যুদ্ধবিরতি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। কিছু সামরিক উপদেষ্টা মনে করছেন, দুই সপ্তাহ সময় খুবই নগণ্য। এই সময়ের মধ্যে বড় কোনো পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। অন্যদিকে, ট্রাম্পের অনুসারীরা মনে করছেন, প্রেসিডেন্টের কঠোর অবস্থানের কারণেই ইরান অন্তত সাময়িকভাবে হলেও পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে, যা ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যক্তিগত ইমেজের জন্য একটি বড় পাওনা।
ট্রাম্পের এই ‘টোটাল ভিক্টরি’ বা সর্বাত্মক বিজয়ের দাবিকে অনেকে আসন্ন নির্বাচনের রাজনীতির অংশ হিসেবেও দেখছেন। ভোটারদের কাছে নিজের শক্তিশালী ভাবমূর্তি তুলে ধরতে এর চেয়ে বড় সুযোগ আর হতে পারে না। তবে যুদ্ধবিরতির ময়দানে শান্তি কতটা স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করছে আগত দিনগুলোতে দুই দেশের গোয়েন্দা এবং কূটনৈতিক তৎপরতার ওপর।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতা এবং চীনের সম্ভাব্য প্রবেশ এই পুরো বিষয়টিকে একটি বহুমাত্রিক রূপ দিয়েছে। কেবল ওয়াশিংটন আর তেহরান নয়, এখন বেইজিং এবং ইসলামাবাদের নজরও থাকবে এই দুই সপ্তাহের প্রতিটি ঘণ্টার ওপর। যদি ১৪ দিন পর আবার গোলাবর্ষণ শুরু হয়, তবে তার দায়ভার কে নেবে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আপাতত মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে রণতরী আর ড্রোনগুলোর আনাগোনা কিছুটা কমলেও উত্তাপ কমেনি। ট্রাম্পের দাবি যদি সত্যি হয়, তবে ইরান হয়তো বড় কোনো ছাড় দিতে চলেছে। আর যদি এটি কেবলই রাজনৈতিক বক্তব্য হয়, তবে দুই সপ্তাহ পর বিশ্ব এক ভয়াবহ সংঘাতের সাক্ষী হতে পারে। আপাতত বিশ্ব তাকিয়ে আছে বেইজিং আর তেহরানের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।
সংঘাতের এই ক্রান্তিকালে সাধারণ মানুষের মনে একটাই প্রার্থনা—এই ১৪ দিনের সাময়িক বিরতি যেন দীর্ঘস্থায়ী শান্তির পথ প্রশস্ত করে। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পের রণকৌশল এবং তেহরানের একগুঁয়েমি সেই পথকে কতটা মসৃণ হতে দেবে, তা সময়ই বলে দেবে। আপাতত ওয়াশিংটন তাদের ‘বিজয়’ উদ্যাপনে ব্যস্ত, আর তেহরান ব্যস্ত তাদের পরবর্তী চাল নির্ধারণে।

