জাতীয় সংসদের ফ্লোরে দাঁড়িয়ে এক ঐতিহাসিক ও আবেগঘন বক্তব্য দিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বর্তমান সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। মঙ্গলবার বিকেলে সংসদের প্রথম অধিবেশনে ‘জুলাই সনদ’-এর ওপর আনা এক গুরুত্বপূর্ণ মুলতবি প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি নিজেকে একটি ‘শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান’ হিসেবে পরিচয় দেন। স্বাধীনতার পাঁচ দশক পর সংসদের ভেতরে জামায়াত নেতার এমন বক্তব্য রাজনৈতিক মহলে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে শুরু হওয়া এই অধিবেশনে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “স্বাধীনতার ৫৪ বছর পার হলেও এ দেশের মানুষের পূর্ণ আকাঙ্ক্ষা আজও বাস্তবায়িত হয়নি। আমি নিজেও একটি ক্ষুদ্র শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান। মহান মুক্তিযুদ্ধে যারা জীবন দিয়েছিলেন, আমার পরিবারও কয়েক ফোঁটা রক্ত দিয়ে সেই ত্যাগের শরিক হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছে।” স্পিকারকে একজন ‘গর্বিত বীর মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে সম্বোধন করে তিনি মনে করিয়ে দেন যে, বাংলাদেশ কারো একার নয়, বরং সবার।
আলোচনায় বিরোধীদলীয় নেতা দেশের গণতান্ত্রিক বিবর্তনের ইতিহাস তুলে ধরেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বংশপরম্পরায় বা রাজতন্ত্রের কোনো স্থান নেই, সেখানে শাসনভার থাকবে জনগণের হাতে। কিন্তু বাংলাদেশে বারবার জনগণের ভোটের অধিকার খর্ব করা হয়েছে। ১৯৭২ সালের সংবিধান এবং পরবর্তী সময়ে বহুদলীয় গণতন্ত্রকে হত্যা করে ‘একদলীয় বাকশাল’ কায়েম করার সমালোচনা করে তিনি বলেন, যখন শাসনব্যবস্থা একদলীয় হয়ে যায়, তখন ভোটাধিকারের আর কোনো মূল্য থাকে না।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের কড়া সমালোচনা করে ডা. শফিকুর রহমান ২০০৮ সালের নির্বাচনকে একটি ‘বোঝাপড়ার নির্বাচন’ হিসেবে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, “ফ্যাসিস্ট সরকারের হাতে নির্যাতনের শিকার হননি এমন কোনো সদস্য বোধহয় এই সংসদে নেই। নির্যাতনের ভয়াবহতা এতটাই ছিল যে, অনেকে নিজের জন্মস্থানের মাটি আঁকড়ে ধরে থাকতে পারেননি।” তিনি অভিযোগ করেন, দীর্ঘ সময় ধরে জাতির ওপর তাণ্ডব চালানো হয়েছে, যার ফলে অসংখ্য মায়ের বুক খালি হয়েছে এবং অনেক শিশু এতিম হয়েছে।
সংসদকে স্তম্ভিত করে দিয়ে তিনি গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। ডা. শফিকুর জানান, গুম হওয়া ২৩৫ জন মানুষ এখনো ফিরে আসেননি এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা আজও জানেন না তারা বেঁচে আছেন কি না। এ ছাড়া ২ হাজার ৬৬২ জন মানুষ বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাষ্ট্রের প্রতিটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে দলীয় স্বার্থে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানকে এই ফ্যাসিবাদের শেষ পরিণতি হিসেবে উল্লেখ করেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, “আমাদের দেশের ক্যালেন্ডারে ৩৬ জুলাই বলে কিছু ছিল না, কিন্তু তরুণ সমাজের আন্দোলনের মুখে ৫ আগস্ট তা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।” এই আন্দোলনে চার বছরের শিশু থেকে শুরু করে শ্রমজীবী মানুষ ও মায়েদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের কথা স্মরণ করে তিনি শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে তিনি একটি বৈষম্যহীন ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি জানান, দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল ও সমন্বয়কদের সাথে আলোচনার ভিত্তিতে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংস্কার প্রস্তাবগুলো এখন একটি চূড়ান্ত রূপ নিচ্ছে। প্রেসিডেন্টের আদেশের মাধ্যমে সেই সংস্কারের পথে দেশ এগিয়ে যাবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন। ডা. শফিকুরের এই ভাষণটি কেবল সংসদীয় বিতর্ক নয়, বরং বাংলাদেশের বদলে যাওয়া রাজনৈতিক পরিস্থিতির একটি শক্তিশালী দালিলিক রূপ হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা।

