পারস্য উপসাগরের উত্তাল পরিস্থিতিতে বিশ্বজুড়ে যখন জ্বালানি হাহাকার তুঙ্গে, ঠিক তখনই মিত্র দেশগুলোর প্রতি চরম কঠোর বার্তা দিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র আর কোনো দেশকে সামরিক বা কৌশলগত সহায়তা দেবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন তিনি। মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ এক বিস্ফোরক পোস্টে তিনি এই ঘোষণা দেন।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এল যখন ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার যুদ্ধংদেহী পরিস্থিতির কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আকাশচুম্বী। বিশেষ করে জেট ফুয়েল বা বিমানের জ্বালানির তীব্র সংকটে পড়েছে ইউরোপের দেশগুলো। ট্রাম্পের স্পষ্ট কথা—যেসব দেশ ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পাশে দাঁড়ায়নি, তাদের দায়ভার ওয়াশিংটন আর বহন করবে না।
ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, “হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকার কারণে যুক্তরাজ্যের মতো যেসব দেশ বর্তমানে বিমানের জ্বালানি সংকটে ভুগছে, অথচ ইরানকে পরাস্ত করার লড়াইয়ে আমাদের সঙ্গী হয়নি—তাদের জন্য আমার দুটি সহজ পরামর্শ আছে।” তিনি অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে বলেন, “প্রথমত, আপনাদের যদি জ্বালানি লাগে তবে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কিনুন, আমাদের ভাণ্ডারে প্রচুর উদ্বৃত্ত আছে। আর দ্বিতীয়ত, যদি সাহস থাকে তবে নিজেরাই হরমুজে যান এবং নিজেদের তেল ছিনিয়ে আনুন।”
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলার পর পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ হিসেবে ইরান বিশ্ববাণিজ্যের ধমনী হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়। উল্লেখ্য, বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। এই অচলাবস্থার ফলে বিশ্বজুড়ে তেলের দাম গত কয়েক বছরের রেকর্ড ভেঙেছে, যা দেশভেদে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস তুলছে।
ট্রাম্প তার পোস্টে আরও যোগ করেন, “আপনাদের এখন শিখতে হবে কীভাবে নিজের জন্য লড়াই করতে হয়। কারণ যুক্তরাষ্ট্র আর সেখানে আপনাদের পাহারাদার হিসেবে থাকবে না। ইরানের কোমর আমরা ভেঙে দিয়েছি, কঠিন অধ্যায়টি আমাদের পক্ষ থেকে সম্পন্ন হয়েছে। এখন নিজেদের তেলের নিরাপত্তা নিজেদেরই নিশ্চিত করতে হবে।”
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ট্রাম্পের এই মন্তব্য মূলত ন্যাটোভুক্ত দেশ এবং এশিয়ার মিত্রদের প্রতি এক ধরনের প্রচ্ছন্ন হুমকি। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির অধীনে এখন থেকে কোনো দেশকেই বিনামূল্যে সামরিক সুরক্ষা দেওয়া হবে না। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত জলসীমায় মার্কিন নৌবাহিনীর উপস্থিতি কমিয়ে আনার এই ইঙ্গিত বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ তৈরি করতে পারে।
এদিকে, ট্রাম্পের এই আহ্বানের পর আন্তর্জাতিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। মিত্র দেশগুলো এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। কারণ মার্কিন সহায়তা ছাড়া হরমুজ প্রণালীর মতো বিপজ্জনক এলাকায় বাণিজ্যিক জাহাজ পরিচালনা করা প্রায় অসম্ভব। অন্যদিকে, ট্রাম্পের এই প্রস্তাবিত ‘তেল বাণিজ্য’ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির জন্য লাভজনক হলেও, তা বৈশ্বিক কূটনৈতিক সম্পর্ককে আরও তিক্ত করে তুলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
যুদ্ধবিধ্বস্ত মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যখন কামানের গর্জন, তখন ট্রাম্পের এই ‘নিজেদের তেল নিজেরা আনুন’ নীতি বিশ্বমঞ্চে এক নতুন স্নায়ুযুদ্ধের আভাস দিচ্ছে। যেখানে কেবল সামরিক শক্তি নয়, বরং জ্বালানি সম্পদই হয়ে দাঁড়িয়েছে দাবার প্রধান ঘুঁটি।

