মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধক্ষেত্রে বিস্ফোরণের শব্দ যত বাড়ছে, তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাত সমুদ্র তেরো নদী দূরের মার্কিন নাগরিকদের পকেটে। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের প্রভাবে আমেরিকায় হু হু করে বাড়ছে জ্বালানি তেলের দাম। আজ মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন গ্যাসের দাম ৪ ডলারের মনস্তাত্ত্বিক সীমা অতিক্রম করেছে, যা ২০২২ সালের পর দেশটিতে সর্বোচ্চ মূল্যবৃদ্ধি।
সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে গত মাত্র এক মাসেই প্রতি গ্যালন গ্যাসের দাম বেড়েছে প্রায় ১ ডলার। বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দুই মেয়াদের দীর্ঘ শাসনকালে জ্বালানির দামে এমন উল্লম্ফন আগে কখনো দেখা যায়নি। গত মাসেও যেখানে এক গ্যালন গ্যাসের দাম ছিল ২ দশমিক ৯৮ ডলার, মাত্র ৩০ দিনের ব্যবধানে তা প্রায় ৩৪ দশমিক ৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৪ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে।
জ্বালানি বাজারের তথ্য বিশ্লেষণ করে সিএনএন জানিয়েছে, ২০০৫ সালের প্রলয়ঙ্করী হারিকেন ক্যাটরিনা কিংবা ২০২২ সালে ইউক্রেনে রুশ হামলার সময়ও এক মাসের ব্যবধানে দাম বাড়ার গতি এতটা তীব্র ছিল না। যদিও ২০২২ সালে রাশিয়ার অভিযানের সময় এক পর্যায়ে গ্যাসের দাম ৫ ডলার ছাড়িয়েছিল, তবে বর্তমান বৃদ্ধির দ্রুততা ঐতিহাসিক সব রেকর্ডকে পেছনে ফেলে দিচ্ছে।
গ্যাসের পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অপরিশোধিত তেলের (Crude Oil) দামও। সোমবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যখন হুঁশিয়ারি দেন যে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত আরও বড় আকার ধারণ করতে পারে, তখনই বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়। ফলে ২০২২ সালের পর প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রে এক ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের দাম ১০০ ডলারের কোটা পার করেছে।
এই সংকটের মূলে রয়েছে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালী’। ইরানে হামলার পর তেহরান এই জলপথটি বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। উল্লেখ্য, বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই সরু প্রণালী দিয়েই পরিবাহিত হয়। যদিও যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী দেশ এবং তারা মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর সরাসরি খুব বেশি নির্ভরশীল নয়, তবুও বিশ্ববাজারের অস্থিরতা থেকে তারা মুক্ত থাকতে পারছে না।
জ্বালানির এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাধারণ আমেরিকানদের প্রাত্যহিক যাতায়াত খরচ এবং পণ্য পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা প্রবল হচ্ছে। ট্রাম্প একদিকে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক শক্তিতে ইরানকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করছেন, অন্যদিকে নিজ দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে তেলের এই আগুন নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, ইরান যদি দীর্ঘমেয়াদে হরমুজ প্রণালী অবরোধ করে রাখে, তবে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১৫০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। সেক্ষেত্রে মার্কিন পাম্পগুলোতে গ্যাসের দাম ৫ থেকে ৬ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়া কেবল সময়ের ব্যাপার। রণক্ষেত্রের গোলাগুলি আপাতত মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও, এর অর্থনৈতিক ধ্বংসযজ্ঞ এখন মার্কিন ঘরদোরকেও আক্রান্ত করছে।

