মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা এখন চরম সীমায়। ইরানের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ শহর ইস্ফাহানের একটি প্রধান অস্ত্রাগার লক্ষ্য করে অত্যন্ত শক্তিশালী ‘বাঙ্কার বাস্টার’ বোমা নিক্ষেপ করেছে মার্কিন বিমান বাহিনী। মঙ্গলবার ভোররাতে চালানো এই হামলায় ব্যবহৃত বোমার ওজন ছিল প্রায় ৯০০ কেজি (২০০০ পাউন্ড)। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে এই বিধ্বংসী অভিযানের খবর নিশ্চিত করা হয়েছে।
হামলার ভয়াবহতা বর্ণনা করতে গিয়ে একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানান, এটি কোনো সাধারণ অভিযান ছিল না। ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ বা সুরক্ষিত স্থাপনা ধ্বংস করতে সক্ষম এমন বিপুল সংখ্যক বাঙ্কার বাস্টার বোমা এই অভিযানে ব্যবহার করা হয়েছে। ইস্ফাহান শহরটি ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম হৃৎপিণ্ড, যেখানে ২৩ লাখ মানুষের বসবাসের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক বিমানঘাঁটি ও পারমাণবিক গবেষণাগার রয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই হামলার একটি ভিডিও শেয়ার করেছেন। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, একের পর এক বিস্ফোরণের পর আগুনের লেলিহান শিখা রাতের আকাশকে উজ্জ্বল কমলা রঙে রাঙিয়ে দিয়েছে। ট্রাম্প ভিডিওটির সাথে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি না দিলেও এটি যে তেহরানের জন্য একটি শক্তিশালী বার্তা, তা স্পষ্ট। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি ভিডিওটির সত্যতা যাচাই করার চেষ্টা করলেও পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তনের কারণে তা এখনো স্বতন্ত্রভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
এই সামরিক অভিযানের ঠিক একদিন আগে, সোমবার ট্রাম্প ইরানকে এক চরম হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, যদি দ্রুত যুদ্ধ সমাপ্তির কোনো চুক্তি না হয়, তবে ইরানের জ্বালানি খাত, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, এমনকি পারমাণবিক ও পানি সরবরাহ ব্যবস্থাও মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হবে। মঙ্গলবারের এই হামলাকে সেই হুমকিরই প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা।
ওয়াশিংটন এবং তেল আবিব দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছে যে, ইরান গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে। যদিও জাতিসংঘের পারমাণবিক তদারকি সংস্থা এই দাবির সপক্ষে এখনো কোনো চূড়ান্ত প্রমাণ দেয়নি, তবুও মার্কিন-ইসরায়েল যৌথ বাহিনী ইরানের সামরিক সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দিতে মরিয়া। ট্রাম্প এর আগেও দাবি করেছিলেন যে, তার নির্দেশে চালানো আগের হামলায় ইরানের অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ হয়ে গেছে।
ইস্ফাহানের আকাশে বারুদের যে ধোঁয়া দেখা যাচ্ছে, তা কেবল একটি শহরের ক্ষয়ক্ষতি নয়, বরং পুরো অঞ্চলের অস্থিতিশীলতার প্রতিচ্ছবি। বিশেষ করে ৯০০ কেজির মতো শক্তিশালী বাঙ্কার বাস্টার বোমার ব্যবহার প্রমাণ করে যে, এবারের লক্ষ্য ছিল মাটির গভীরে লুকানো ইরানের অত্যন্ত সুরক্ষিত গোলাবারুদ ডিপো বা কৌশলগত সম্পদ।
যুদ্ধের এই নতুন মাত্রা বিশ্ব অর্থনীতিতেও কম্পন ধরিয়েছে। হামলার খবরের পর থেকেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যদি এই হামলার পাল্টা জবাব দেয় বা পারমাণবিক চুক্তি থেকে চূড়ান্তভাবে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়, তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। আপাতত ধ্বংসস্তূপের নিচে ইরানের কতটা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা নিরূপণে কাজ করছে তেহরান। তবে ইস্ফাহানের সেই কমলা রঙের আকাশ বিশ্ববাসীর মনে এক গভীর অনিশ্চয়তার জন্ম দিয়েছে।

