মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ যখন বারুদের গন্ধে ভারী, ঠিক তখনই ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তেহরান যদি অবিলম্বে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য উন্মুক্ত না করে, তবে দেশটির বিদ্যুৎকেন্দ্র, তেলকূপ এবং প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র ‘খারগ দ্বীপ’ বোমা মেরে উড়িয়ে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
সোমবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প স্পষ্ট করে বলেন, কোনো চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব না হলে ইরানে সামরিক অভিযান আরও জোরদার করা হবে। তিনি লিখেছেন, “আলোচনায় অনেক অগ্রগতি হয়েছে ঠিকই; কিন্তু যদি দ্রুত কোনো সমাধানে আসা না যায় এবং হরমুজ প্রণালি বাণিজ্যের জন্য খুলে দেওয়া না হয়, তবে আমরা ইরানের সব বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র ও তেল অবকাঠামো ধ্বংস করে দেব। বিশেষ করে খারগ দ্বীপকে পুরোপুরি মানচিত্র থেকে মুছে দিয়ে আমাদের এই অভিযান শেষ করব।”
উল্লেখ্য, ইরানের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো এই খারগ দ্বীপ। দেশটির অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই সম্পন্ন হয় এই ক্ষুদ্র কিন্তু কৌশলগত দ্বীপটির মাধ্যমে। মাত্র ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এই দ্বীপে রয়েছে বিশাল তেলের মজুত ট্যাঙ্ক, পাইপলাইন এবং গভীর সমুদ্রবন্দরের সুবিধা। এখান থেকে প্রতিদিন গড়ে ১৩ থেকে ১৬ লাখ ব্যারেল তেল চীনসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হয়। ট্রাম্পের এই হুমকি কার্যকর হলে ইরানের অর্থনীতি কার্যত পঙ্গু হয়ে পড়বে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেন, প্রয়োজনে মার্কিন সৈন্যরা খারগ দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে। তিনি সরাসরি ইঙ্গিত দেন যে, ইরানের তেলের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাই এখন তার অগ্রাধিকার। ট্রাম্পের ভাষায়, “আমরা খারগ দ্বীপ দখল করতেও পারি, আবার নাও পারি। আমাদের সামনে সব বিকল্পই খোলা আছে। এখনও ইরানে আমাদের প্রায় ৩ হাজার লক্ষ্যবস্তু রয়েছে, যেখানে মার্কিন সেনারা হামলা চালানোর জন্য প্রস্তুত।”
তবে হম্বিতম্বির পাশাপাশি আলোচনার দরজাও খোলা রেখেছেন এই রিপাবলিকান নেতা। রোববার রাতে এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে সরাসরি এবং পরোক্ষ—উভয় মাধ্যমেই সংলাপ চালিয়ে যাচ্ছে। ট্রাম্পের ভাষায় এই বৈপরীত্য বেশ স্পষ্ট। তিনি বলেন, “আমরা অত্যন্ত সুবিধাজনক অবস্থানে আছি। তবে ইরানের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট করে কিছু বলা যায় না; কারণ একদিকে আমাদের আলোচনা করতে হয়, আবার নিয়মিত বিরতিতে তাদের স্থাপনাগুলো উড়িয়েও দিতে হয়।”
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্পের এই চরম হুঁশিয়ারি মূলত তেহরানকে দ্রুত একটি চুক্তিতে বাধ্য করার কৌশল। একদিকে অর্থনৈতিক অবরোধ ও সামরিক হামলা, অন্যদিকে আলোচনার প্রস্তাব দিয়ে তিনি ইরানকে কোণঠাসা করতে চাইছেন। বিশেষ করে স্পেনসহ ইউরোপের কিছু দেশ মার্কিন যুদ্ধবিমানের জন্য আকাশসীমা বন্ধ করে দেওয়ায় ট্রাম্প এখন মধ্যপ্রাচ্যের ভেতরেই তার সামরিক শক্তি সংহত করার চেষ্টা করছেন।
আপাতত বিশ্ববাজারের নজর এখন হরমুজ প্রণালির দিকে। এই নৌপথ বন্ধ থাকায় বিশ্বজুড়ে তেলের দাম আকাশচুম্বী হওয়ার উপক্রম হয়েছে। ট্রাম্পের এই ‘সব উড়িয়ে দেওয়ার’ হুমকি যদি বাস্তবে রূপ নেয়, তবে মধ্যপ্রাচ্য এক দীর্ঘস্থায়ী ও বিধ্বংসী যুদ্ধের কবলে পড়বে, যার প্রভাব থেকে মুক্ত থাকবে না বিশ্ব অর্থনীতির কোনো প্রান্তই। তেহরান এখন ট্রাম্পের এই আলটিমেটামের জবাবে কী পদক্ষেপ নেয়, সেটাই দেখার বিষয়।

