মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে উত্তেজনা এখন চরম সীমায়। ইরানের অস্ত্র কারখানায় ইসরায়েলি বিমান হামলার কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে পাল্টা আঘাত হেনেছে তেহরান। সোমবার বিকেলে ইরান থেকে ছোড়া একঝাঁক ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলীয় বন্দর নগরী হাইফার একটি বিশাল তেল শোধনাগারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়া গেছে।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ‘চ্যানেল ১২’-এর প্রচারিত ফুটেজে দেখা যায়, হাইফার আকাশ ঘন কালো ধোঁয়ায় ছেয়ে গেছে। শোধনাগারটির একটি অংশে দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে। সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরান থেকে ধেয়ে আসা একঝাঁক নতুন ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করার ঠিক পরপরই এই বিস্ফোরণ ও আগুনের ঘটনা ঘটে। তবে ঠিক কতটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে বা ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কত, তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
ঘটনাস্থলে দ্রুত উদ্ধারকারী দল ও ফায়ার সার্ভিস পাঠানো হয়েছে। এই হামলা ইসরায়েলের জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর বড় ধরনের আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে যখন ইসরায়েল দাবি করছিল যে তারা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দিয়েছে, ঠিক তখনই হাইফায় এই সফল হামলা তেল আবিবকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে।
পাল্টা জবাব দিতে দেরি করেনি ইসরায়েলও। আইডিএফ (IDF) দাবি করেছে, তারা তেহরানের উপকণ্ঠে কয়েক ডজন গোপন অস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্রে নতুন করে হামলা চালিয়েছে। ইসরায়েলি বাহিনীর প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিল ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কারখানাগুলো। তাদের দাবি, ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ অকেজো করে দেওয়াই এখন তাদের মূল কৌশল।
এদিকে, এই সংঘাতের সমীকরণ আরও জটিল করে তুলেছে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) একটি সাম্প্রতিক রিপোর্ট। সংস্থাটি নিশ্চিত করেছে যে, ইরানের খন্দাবে অবস্থিত ভারী পানি উৎপাদন প্ল্যান্টটি গত শুক্রবারের ইসরায়েলি হামলায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমানে ওই কেন্দ্রটি পুরোপুরি অকেজো হয়ে পড়েছে বলে জানা গেছে।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর দাবি, খন্দাবের ওই স্থাপনাটি কেবল পানি উৎপাদন কেন্দ্র ছিল না, বরং এটি ছিল পারমাণবিক অস্ত্রের অপরিহার্য উপাদান ‘প্লুটোনিয়াম’ তৈরির প্রধান কারখানা। এই কেন্দ্রটি অকেজো হয়ে যাওয়ার অর্থ হলো ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা অন্তত কয়েক বছরের জন্য পিছিয়ে যাওয়া। তবে তেহরান এই দাবিকে বরাবরের মতোই প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
যুদ্ধের এই পর্যায়ে দুই দেশই একে অপরের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার নীতি গ্রহণ করেছে। একদিকে ইরানের পারমাণবিক ও অস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্রগুলো লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে, অন্যদিকে ইসরায়েলের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো আক্রান্ত হচ্ছে। এই পাল্টাপাল্টি হামলা কেবল দুই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর প্রভাব পড়ছে বিশ্ববাজারের তেলের দাম এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, হাইফায় আগুনের লেলিহান শিখা এবং খন্দাবে পারমাণবিক অবকাঠামো ধ্বংস হওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে যে, কোনো পক্ষই পিছু হটতে রাজি নয়। কূটনীতির টেবিলে যখন আলোচনার গুঞ্জন চলছে, ঠিক তখনই রণক্ষেত্রে আগুনের এই লড়াই পরিস্থিতিকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন কেবল যুদ্ধবিমানের গর্জন আর ক্ষেপণাস্ত্রের আলোয় আলোকিত, যেখানে শান্তির সম্ভাবনা ক্রমেই ফিকে হয়ে আসছে।

